ভূমিকম্পের কারণে নয়, হিমবাহধসের জেরেই নেপালের ভোটেকোশী নদীতে ভয়াবহ হড়পা বান হয়েছিল বলে মনে করছে আমেরিকার ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিয়োলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস)। বুধবার রাতে সংস্থার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানানো হয়েছে, যে ভূতাত্ত্বিক কম্পনকে প্রথমে ভূমিকম্প বলে মনে করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহধস। হিমবাহের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদামাটি নদীর অববাহিকার দিকে নেমে আসার ফলেই এই ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংস্থাটি।
এদিকে, ভোটেকোশী নদীর হড়পা বানে নেপালে মৃতের সংখ্যা আরও বেড়েছে। ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত অন্তত ২৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন বহু মানুষ। নেপালের পর্যটন দফতরের মুখপাত্র সুরজ ঘিমিরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত পর্যন্ত ৮২৬ জন পর্যটকের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। সংবাদসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯৩ জন বিদেশি এবং ৭৫ জন নেপালি নাগরিক। বিদেশিদের মধ্যে ১৪১ জন ভারতীয়, যাঁদের মধ্যে ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়ও রয়েছেন। তাঁদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর খবর অনুযায়ী, তাঁরা কৈলাস-মানস সরোবর যাওয়ার পথে ছিলেন।
অন্যদিকে, চিনা সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে সংবাদসংস্থা এপি জানিয়েছে, হড়পা বানের প্রভাবে তিব্বতে অন্তত তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজের সংখ্যা ৫৫৮-এরও বেশি।
এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের রাসুয়া জেলা। তুলনায় কম হলেও নুয়াকোট ও ধাদিং জেলাতেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রবল কাদা ও জলের স্রোতে নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন তিব্বতের জিরং স্থলবন্দর এলাকাতেও বিপর্যয়ের খবর পাওয়া গিয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরে রাসুয়া জেলায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। তিব্বত থেকে নেপালে ঢুকে এই জেলার উপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে ভোটেকোশী নদী। বুধবার রাত সাড়ে ৮টার কিছু পরেই আচমকা নদীর জলস্তর বেড়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসনের ধারণা, তিব্বতের দিক থেকেই বন্যার জল নেপালে প্রবেশ করে। চিন সীমান্তবর্তী তিমুর ও স্যাব্রুবেসী এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে জানা যায়।
রাসুয়ার জেলাশাসক নগেন্দ্র পারিয়ার রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বেশ কয়েকটি গ্রামীণ এলাকা জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, ব্যাপক সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণহানিও হয়েছে।
নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খনাল বুধবার সংসদে জানিয়েছিলেন, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট নাগাদ একটি ভূমিকম্প হয়। এরপর তুষারধস নামে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই হড়পা বান আছড়ে পড়ে।
তবে ইউএসজিএস-এর পর্যবেক্ষণ সেই দাবির সঙ্গে মিলছে না। সংস্থাটি জানিয়েছে, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে কোনও ভূমিকম্প হয়নি। যে ঘটনাকে প্রথমে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহধস এবং তার ফলে সৃষ্ট কাদামাটির স্রোত। ভূবিজ্ঞানীদের একাংশের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তুষারধসের ফলে পাথর ও বরফের স্তূপে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ আটকে যায়। পরে সেই বাধার পিছনে জল জমে চাপ বাড়তে থাকে। একসময় বাঁধের মতো তৈরি হওয়া ওই প্রাকৃতিক অবরোধ ভেঙে যাওয়াতেই আচমকা হড়পা বান তৈরি হয়।
নেপালে ঢোকার পর ভোটেকোশী নদী গিয়ে মিশেছে ত্রিশুলি নদীতে। ফলে এই দুর্যোগের পর ত্রিশুলি নদীর তীরবর্তী এলাকাতেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান ও গোর্খা জেলার নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে নেপালের দুর্যোগ মোকাবিলা দফতর। প্রয়োজন হলে নদীর ধার থেকে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
হিমালয়ে হিমবাহধস থেকে হড়পা বানের আশঙ্কা যে ক্রমশ বাড়ছে, তা নিয়ে আগেই সতর্ক করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের হিমবাহগুলি দ্রুত গলছে। ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায় প্রকাশিত ওই গবেষণায় ভারত, চিন, নেপাল, ভুটান এবং চিন-অধিকৃত তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকার প্রায় ৪০ বছরের উপগ্রহ-তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গবেষকদের দাবি ছিল, ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যে হারে হিমবাহের বরফ গলেছে, ২০০০ সালের পর থেকে সেই হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এর মধ্যেই তিব্বতের মানস সরোবরের কাছে আনসি হিমবাহ থেকে উৎপন্ন ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্ন অববাহিকায় চিনের বৃহৎ বাঁধ নির্মাণকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিব্বত থেকে ভারতে প্রবেশের পর এই নদীই ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত। আবার বাংলাদেশে প্রবেশের পর ব্রহ্মপুত্রের নাম হয় যমুনা। ফলে ভবিষ্যতে হিমবাহধস বা হড়পা বানের মতো দুর্যোগে ওই অঞ্চলের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভারত ও বাংলাদেশেও ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।







