খেলাধুলা

৬৩ নট আউট: যে দিনে স্তব্ধ হয়েছিল ক্রিকেট মাঠের হাসি

আজ ২৭ নভেম্বর। ক্রিকেট মাঠের ২২ গজে বল-ব্যাটের লড়াই ছাপিয়ে এই দিনটি প্রতি বছর ফিরে আসে এক গভীর বিষাদের বার্তা নিয়ে। এই দিনটি মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে জীবনের খেলা মাঝপথে থেমে গিয়েছিল। আজ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের এক হাসিখুশি, উজ্জ্বল প্রতিভা, ফিলিপ জোল হিউজ-এর মৃত্যুবার্ষিকী। মাত্র ২৫ বছর বয়সে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তিনি বিদায় নিয়েছিলেন, আর তাঁর স্মৃতিতে ক্রিকেট বিশ্ব আজও এক নীরব কান্না ধরে রাখে। যে হাসি দিয়ে তিনি ২২ গজে প্রবেশ করতেন, সেই হাসিই যে এত দ্রুত নিভে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি।

নিউ সাউথ ওয়েলসের ছোট্ট শহর ম্যাকসভিল থেকে উঠে এসেছিলেন এই বাঁ-হাতি ওপেনিং ব্যাটসম্যান। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল নির্ভীকতা এবং সহজাত প্রতিভা।মাত্র ২০ বছর বয়সে ২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে তাঁর টেস্ট অভিষেক হয়। নিজের দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচেই ডারবানে তিনি প্রথম ইনিংসে ১১৫ রান করেন। এক টেস্টে দুটি সেঞ্চুরি করা সর্বকনিষ্ঠ অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড় হিসেবে তিনি বিশ্ব রেকর্ডের মালিক হন।অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তিনি মোট ২৬টি টেস্ট খেলেছেন, যেখানে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ১৫৩৫ রান, যার মধ্যে তিনটি সেঞ্চুরি ও সাতটি হাফ সেঞ্চুরি রয়েছে। ওয়ানডে ক্রিকেটেও তিনি ২৫টি ম্যাচ খেলেছেন।জাতীয় দলে যখন তাঁর জায়গা আরও পাকা হওয়ার মুখে, ঠিক তখনই এক মর্মান্তিক ঘটনা তাঁর স্বপ্নগুলো থামিয়ে দিল।

২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বর, সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে চলছিল শেফিল্ড শিল্ডের একটি ম্যাচ। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ব্যাট করছিলেন ফিল হিউজ। প্রতিপক্ষ নিউ সাউথ ওয়েলসের পেসার শন অ্যাবটের করা একটি বাউন্সার তাঁর হেলমেটের নীচের দিকে, ঘাড়ের বাঁ পাশে আঘাত করে। পাঁচ আউন্স ওজনের সেই বলটি আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন হিউজ। স্টেডিয়ামে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। দ্রুত তাঁকে সিডনির সেন্ট ভিনসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকরা তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখেন। কিন্তু আঘাতটি এতটাই গুরুতর ছিল যে সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। দুই দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে, ২৭ নভেম্বর, তাঁর ২৬তম জন্মদিনের মাত্র কয়েক দিন আগে, হিউজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

হিউজের মৃত্যু কেবল তাঁর পরিবার, বন্ধু মাইকেল ক্লার্ক বা অস্ট্রেলিয়ান দলকেই নয়, নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা ক্রিকেট বিশ্বকে। ক্রিকেট পিচে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এক নিমেষে খেলাটির সৌন্দর্য ও ভয়াবহতা দুটোকেই তুলে ধরেছিল। তাঁর স্মরণে বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটপ্রেমীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘৬৩ নট আউট’ (শেষ ইনিংসে তিনি ৬৩ রানে অপরাজিত ছিলেন) লেখা হ্যাশট্যাগ দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) এই ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু করে এবং ভবিষ্যতে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য হেলমেটের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। হিউজের মৃত্যু ক্রিকেটকে আরও সুরক্ষিত করতে বাধ্য করেছে।

আজও, তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে, ম্যাকসভিল থেকে উঠে আসা এক হাসিখুশি, প্রতিভাবান ব্যাটসম্যানের থেমে যাওয়া জীবনের গল্পটি ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীর ক্ষতচিহ্ন রেখে যায়। হিউজ হয়তো নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতি এবং রেখে যাওয়া শূন্যতা ক্রিকেট পিচে আজও এক নীরব কান্না হয়ে বাজে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Adblock Detected

Please Turn Off Your Ad Blocker.