২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আর জি কর-কাণ্ড যে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছিল, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। মেয়ের মৃত্যুর বিচার চেয়ে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়েছিলেন অভয়ার মা রত্না দেবনাথ। জনসমর্থনও পেয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, গত কয়েকদিন ধরে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদ ও বিধায়কদের অনেকেই আর জি কর প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন। এই আবহেই তাঁদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করলেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পেশায় চিকিৎসক দুই সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও শর্মিলা সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আর জি করে আসলে কী ঘটেছিল? সাহস থাকলে সিবিআইয়ের কাছে গিয়ে সত্যিটা বলুন।” তাঁর এই মন্তব্যের পর নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল, আর জি কর-কাণ্ডে তৎকালীন রাজ্য সরকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছিল। কল্যাণের বক্তব্য সেই বিতর্ককেই আরও উসকে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর কার্যত ভাঙনের মুখে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের ফসল তৃণমূল কংগ্রেস। সম্প্রতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিদ্রোহের জেরে পরিষদীয় দলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন তিনি। সোমবার দিল্লিতে নাটকীয় রাজনৈতিক ঘটনার পর সংসদীয় দলেও ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল। জানা গিয়েছে, দলের ২০ জন সাংসদ এনডিএ-তে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে চিঠি জমা দিয়েছেন। একই দিনে দলীয় সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশও হাতছাড়া হয়েছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর। বিদ্রোহীরা সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ না করলেও দলীয় নীতি ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার তাঁদের ‘সুখের পায়রা’ বলে কটাক্ষ করেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
তাঁর কথায়, “দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। তাই এখনও মুখ্যমন্ত্রীর আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। ক্ষমতা ছাড়া এরা থাকতে পারবে না। তবে বিজেপিও এদের গ্রহণ করবে না। কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে, সব তথ্য বিজেপির কাছে আছে। নারদা-কাণ্ড থেকে শুরু করে নানা বিষয় তাদের জানা। বিজেপি কলঙ্কিত ভাবমূর্তির কাউকে নেবে না।” বিদ্রোহীদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, “কাকলি ঘোষ ছাড়া বাকিরা সকলেই ২০১১ সালের পরে দলে এসেছে। আন্দোলন-সংগ্রামের কোনও ইতিহাস নেই। বহু তারকা নেতা বাইরের মানুষ। কেষ্ট মণ্ডল না থাকলে শতাব্দী রায় কোনওদিন জিততে পারতেন না। এঁরা তৃণমূলের সাধারণ কর্মীদের প্রতি অন্যায় করেছেন।”
এরপরই আর জি কর প্রসঙ্গ টেনে কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শর্মিলা সরকার এবং অভয়ার মাকে নিশানা করেন কল্যাণ। তিনি বলেন, “আর জি কর আন্দোলনের সময় এই দুই চিকিৎসক সাংসদকে কখনও রাস্তায় নামতে দেখা যায়নি। আমি নিজে আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। অভয়া দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছে, আর তার মাকে ব্যবহার করে রাজনীতি করা হচ্ছে। কাকলি ও শর্মিলাকে বলছি, যদি কিছু জানেন, সিবিআইয়ের কাছে গিয়ে জানান।”
তাঁর এই মন্তব্যকে অনেকেই পরস্পরবিরোধী বলে মনে করছেন। কারণ, “আর জি করে কী হয়েছিল” প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে তিনি কি পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে তৎকালীন সরকার সব তথ্য প্রকাশ করেনি? সেই প্রশ্নও রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এছাড়া সিবিআইয়ের তদন্ত নিয়ে এত প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও অভয়ার মা কেন বিজেপিতে যোগ দিলেন, সেই বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন কল্যাণ। তবে তৃণমূলের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতির মাঝেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি জানান, “আমি নেত্রীর সঙ্গে ছিলাম, আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব।”







