লোকসভা ভোটের সময় তৃণমূল কংগ্রেসে এক বড় বিতর্ক ছড়িয়েছিল — ৭০ বছর পেরোনো নেতাদের আর টিকিট দেওয়া উচিত কি না? সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন স্বয়ং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর যুক্তি ছিল, “জনপ্রতিনিধিরা কর্মীও। বয়স ৭০ পেরোলে কর্মক্ষমতা কমে যায়।”
তবু শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলীয় সিদ্ধান্তে সৌগত রায় ও সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রার্থী করেন। অভিষেক ছিলেন নিজের অবস্থানে অনড় — বাংলার ৪২ আসনের মধ্যে ৪০টিতে প্রচার করলেও, এই দুই কেন্দ্র— দমদম ও উত্তর কলকাতায় প্রচারে যাননি।
ফলাফল — দুজনেই জিতেছেন, কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দু’জনেই শারীরিকভাবে দুর্বল। সংসদে যাওয়া-আসা প্রায় বন্ধ। এই ঘটনাই যেন অভিষেকের বক্তব্যকেই নতুন করে প্রমাণ করেছে — “বয়সের সঙ্গে রাজনীতিতে কর্মক্ষমতা কমে যায়।”
এবার ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের আগে ফের সেই বিতর্ক ফিরে এসেছে নতুন রূপে। সূত্রের খবর, তৃণমূল এখন প্রার্থী বাছাইয়ে ‘অ্যাক্টিভিটি অডিট’ চালাচ্ছে। কারা মাঠে সক্রিয়, কারা মানুষের সংস্পর্শে আছেন— সবই খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। গত পাঁচ বছরের কাজ, সংগঠনে উপস্থিতি, ভোটক্ষেত্রে কার্যকলাপ— প্রতিটি বিষয়ই এখন নজরদারিতে।
তৃণমূলের ভিতরের হিসেব:
বর্তমানে দলের বিধায়ক ২১৫ জন। দলবদল করে আসা আরও ৬ জনকে ধরলে সংখ্যা দাঁড়ায় ২২১। এর মধ্যে ৫৭ জনের বয়স ৭০ পেরিয়েছে বা ২০২৬-এর জানুয়ারির মধ্যে পেরোবে। এই ৫৭ জনের মধ্যে রয়েছেন ১৬ জন মন্ত্রী, ৬ জন মহিলা বিধায়ক, এবং ৪ জন চিকিৎসক-বিধায়ক।
জেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী —
দক্ষিণ ২৪ পরগনা: ১১ জন
উত্তর ২৪ পরগনা: ৬ জন
পূর্ব বর্ধমান: ৫ জন
নদীয়া: ৫ জন
পশ্চিম মেদিনীপুর: ৪ জন
তবে সব ৭০-পেরোনো নেতাই যে বাদ পড়বেন, তা নয়। যেমন বজবজের অশোক দেব (৭৬) — প্রতিদিন মাঠে সক্রিয়, ভোটক্ষেত্রে নিয়মিত। সূত্র বলছে, “তিনি পুনরায় টিকিট পাওয়ার যোগ্য।”
এক শীর্ষ তৃণমূল নেতার কথায়,
“রাজনীতির আসল শক্তি মানুষের সঙ্গে সংযোগে। যিনি মাঠে নামছেন, তিনিই দলের সম্পদ। বয়স নয়, কাজই এখন মাপকাঠি।”
অন্য এক নেতা আরও সরাসরি বলেছেন,
“বয়স বাড়া অপরাধ নয়, কিন্তু মাঠে না নামলে রাজনীতিতে টিকে থাকা যায় না। মানুষের দরজায় পৌঁছতে না পারলে, ভোটেও পৌঁছানো যায় না।”
সুতরাং স্পষ্ট বার্তা —
২০২৬-এর ভোটের আগে তৃণমূল কংগ্রেসে ‘কাজই টিকিটের চাবিকাঠি’। যাঁরা সক্রিয়, মাঠে নামছেন, মানুষের সঙ্গে যুক্ত— তাঁরাই পাবেন জায়গা প্রার্থী তালিকায়। আর বাকিদের জন্য? ‘রেড কার্ড’ দেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে কালীঘাট।’
বয়স নয়, অ্যাকশনই এখন আসল আইডেন্টিটি।
৫৭ জন সত্তরোর্ধ্ব বিধায়কের ভাগ্য নির্ভর করছে মাঠের পরিশ্রমে।
ছাব্বিশের আগে অভিষেক বনাম পুরোনো প্রজন্ম— তৃণমূলের ভেতরেই নতুন ‘এজ ডিবেট’ ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে।







