বিদেশবিশ্ব

ঢাকায় ‘দেখামাত্র গুলি’ নির্দেশ ঘিরে তীব্র বিতর্ক, শেখ হাসিনার রায়ের আগে চরম উত্তেজনা

সোমবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার প্রাক্কালে ঢাকাজুড়ে বাড়ছে উত্তেজনা। ঠিক এই আবহেই রাজধানীর পুলিশ কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘প্রয়োজনে দেখামাত্র গুলি’ চালানোর নির্দেশ দেওয়ায় নতুন বিতর্কে তোলপাড় দেশ।

রবিবার বিকেলে পুলিশ ওয়ারলেসে কমিশনারের এই বার্তা প্রচারিত হওয়ার পরই রাজনৈতিক মহল থেকে মানবাধিকার সংগঠন— সর্বত্রই প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের পরামর্শেই কি এই কঠোর নির্দেশ এসেছে?

পুলিশ কমিশনারের ব্যাখ্যা: “আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানোর অধিকার রয়েছে”
প্রতিক্রিয়ার ঝড় ওঠার পর কমিশনার সাজ্জাত আলি জানান,
“ফৌজদারি দণ্ডবিধি অনুযায়ী আত্মরক্ষার্থে পুলিশ মারণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। নাশকতা ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় কঠোর নির্দেশ ছাড়া উপায় ছিল না।”

তবে তিনি সরাসরি ‘দেখামাত্র গুলি’ নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি পাশ কাটিয়ে আত্মরক্ষার যুক্তিকেই ঢাল হিসেবে তুলে ধরেন।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: সরকারের অনুমতি ছিল কি?
কমিশনারের নির্দেশের পর পরই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় প্রশ্ন—
প্রধান উপদেষ্টা ড. মহম্মদ ইউনুস বা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর অনুমতি ছাড়া কি এমন নির্দেশ আসতে পারে?

ইউনুস প্রশাসন অবশ্য এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও রায়ের প্রহর
সোমবার বিচারপতি গোলাম মোর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল যে রায় ঘোষণা করবেন, তার অন্যতম অভিযোগ—
গণঅভ্যুত্থান মোকাবিলায় পুলিশকে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

যদিও আদালতে সরকারপক্ষ এর স্বপক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।
তৎকালীন পুলিশের আইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন রাজসাক্ষী হিসেবে দাবি করেন— স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল নাকি বলেছিলেন, “প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গুলি চালাতে হবে।”
হাসিনা ও কামাল দু’জনেই অভিযোগ অস্বীকার করে ট্রাইব্যুনালের শুনানি বয়কট করেন।

রবিবার-সোমবার সারা দেশে আওয়ামী লিগের শাটডাউন
১০ নভেম্বর থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লিগ রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।
এই অবস্থায় বাসে আগুন, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরসহ নাশকতা বাড়তে থাকায় পুলিশ সরাসরি আওয়ামী লিগকেই দায়ী করেছে।
রবিবার কুমিল্লা ও ঢাকায় দলটির ৫৪ জন কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিএনপি: “দেশে আতঙ্কের পরিবেশ”
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রবিবার সাংবাদিকদের বলেন,
“রায়কে কেন্দ্র করে দেশে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একটি মহল নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছে।”

এর কিছুক্ষণ পরই পুলিশ কমিশনারের ‘দেখামাত্র গুলি’ বার্তা প্রকাশ পায়।

আওয়ামী লিগের ক্ষোভ: “ইউনুস প্রশাসন যুদ্ধ ঘোষণা করেছে”
আওয়ামী লিগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন অভিযোগ করেন—
“ইউনুস প্রশাসন কার্যত আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। শাটডাউন আটকাতে সরকার মরিয়া হয়ে গুলি চালানোর হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু এতে আমাদের কর্মীরা ভয় পাবে না।”

তিনি এটিকে “অবৈধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাজানো রায়” বলে আখ্যা দেন।

চট্টগ্রামে আগে থেকেই ‘দেখামাত্র গুলি’ নির্দেশ
চট্টগ্রামে ১০ নভেম্বরেই নগরীর পুলিশ কমিশনার মেশিনগান পর্যন্ত ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন।
একাংশ পুলিশ সদস্য ইতিমধ্যেই মেশিনগান হাতে টহল দিচ্ছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশন এই নির্দেশকে ‘মানবাধিকার পরিপন্থী ও সরাসরি হত্যার অনুমোদন’ বলে কড়া সমালোচনা করেছে।

ঢাকায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত
চট্টগ্রামের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীতে নতুন করে ‘দেখামাত্র গুলি’ নির্দেশে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে—
সরকারি স্থাপনা ধ্বংস বা অগ্নিসংযোগে যুক্ত সন্দেহভাজন কাউকে পালাতে দেওয়া হবে না; প্রয়োজন হলে গুলিবর্ষণ করা হবে।

রবিবার রাত থেকে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

সারসংক্ষেপ
শেখ হাসিনার রায় ঘোষণার মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে দেশের দু’টি প্রধান মহানগরে পুলিশের ‘দেখামাত্র গুলি’ নির্দেশ—
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে নতুন এক উত্তেজনার পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
রায় ঘোষণার দিন সকালে দেশজুড়ে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়— সেই দিকেই এখন নজর সকলের।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Adblock Detected

Please Turn Off Your Ad Blocker.