খেলাধুলা

দারিদ্র্য থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ— দুতি চাঁদের লড়াই ও অনুপ্রেরণার কাহিনি

১৯৯৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ওড়িশার জাজপুর জেলার গোপালপুর গ্রামে এক দরিদ্র তাঁতশিল্পীর পরিবারে জন্ম নেন দুতি চাঁদ। চরম অভাবের মধ্যেই কেটেছে তাঁর শৈশব। সংসারের টানাপোড়েন সত্ত্বেও ছোট বয়স থেকেই দৌড়ের প্রতি তাঁর আলাদা টান ছিল। মাত্র চার বছর বয়সে দিদির হাত ধরে গ্রামের নদীর পাড়ে দৌড় শুরু করেন তিনি। সেই ছোট্ট দৌড়ই একদিন তাঁকে পৌঁছে দেয় বিশ্ব মঞ্চে।

২০০৬ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে সরকারি স্পোর্টস হোস্টেলে ভর্তি হন দুতি। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর পেশাদার ক্রীড়া জীবনের কঠিন লড়াই। কঠোর পরিশ্রমের ফল মেলে ২০১৩ সালে। তিনি অনূর্ধ্ব-১৮ জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন এবং পুনেতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ২০০ মিটারে ব্রোঞ্জ পদক জিতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেন। একই বছর বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপে ১০০ মিটারের ফাইনালে পৌঁছে প্রথম ভারতীয় নারী স্প্রিন্টার হিসেবে ইতিহাস গড়েন।

তবে ২০১৪ সালে তাঁর জীবনে নেমে আসে চরম সংকট। গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের ঠিক আগে ‘হাইপারঅ্যান্ড্রোজেনিজম’-এর কারণে তাঁকে ভারতীয় দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। কোনো ডোপিং অভিযোগ না থাকলেও শরীরের স্বাভাবিক হরমোনের জন্য এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। অপমান ও মানসিক চাপের মধ্যেও ভেঙে না পড়ে দুতি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালত (CAS)-এ লড়াই চালিয়ে যান। ২০১৫ সালে আদালতের ঐতিহাসিক রায়ে তাঁর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।

এরপর আরও দৃঢ় প্রত্যয়ে ফিরে আসেন দুতি চাঁদ। ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকের যোগ্যতা অর্জন করেন তিনি। ২০১৮ জাকার্তা এশিয়ান গেমসে ১০০ ও ২০০ মিটারে রৌপ্য পদক জিতে পিটি উষার পর দীর্ঘ ৩২ বছর পরে ভারতের সাফল্যের ধারা ফেরান। ২০১৯ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিয়াডে ১০০ মিটারে স্বর্ণপদক জিতে নতুন ইতিহাস লেখেন।

খেলার বাইরেও সমাজের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান নিয়েছেন দুতি চাঁদ। তাঁর জীবনসংগ্রাম আজ তাঁকে কেবল একজন সফল অ্যাথলিট নয়, বরং সাহস, আত্মসম্মান ও অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত প্রতীকে পরিণত করেছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Adblock Detected

Please Turn Off Your Ad Blocker.