রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক ভূমিকা ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে একযোগে ৩০টি বিধানসভা কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করল বিজেপি। দলীয় সূত্রের দাবি, এখনও পর্যন্ত রাজ্যের মোট ৬৫টি বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য এই ধরনের চার্জশিট প্রকাশ করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে গেরুয়া শিবির।
বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলির সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগ, অভিজ্ঞতা ও প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতেই এই চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়েছে। কোথাও স্থানীয় দুর্নীতি, কোথাও প্রশাসনিক ব্যর্থতা, আবার কোথাও জনস্বার্থ সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। একসঙ্গে বহু কেন্দ্রকে সামনে রেখে চার্জশিট প্রকাশ করে নির্বাচনী লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করাই বিজেপির কৌশল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।
চার্জশিটে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। বিজেপির অভিযোগ, বীরভূম ও মুর্শিদাবাদের মতো জেলায় রাজনৈতিক হিংসা, ভোটের সময় বুথ দখল এবং বিরোধী কর্মীদের ভয় দেখানো প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি বেআইনি বালি খাদান, সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ নিয়েও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
আবাস প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও তৃণমূল সরকারকে কাঠগড়ায় তুলেছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (পিএমএওয়াই) কার্যকর করতে অনিয়ম এবং আর্থিক সহায়তা পৌঁছতে দেরির অভিযোগ রয়েছে চার্জশিটে। বিজেপির দাবি, শহরাঞ্চলের বহু দরিদ্র মানুষ এখনও আবাসনের টাকা পাননি। তাদের বক্তব্য, আবাস ও আর্থিক সহায়তার মতো প্রকল্পে স্বচ্ছতাই জনবিশ্বাস অর্জনের মূল চাবিকাঠি।
কর্মসংস্থান দুর্নীতিও চার্জশিটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি ও স্কুলস্তরের নিয়োগে অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে বিজেপির অভিযোগ, রাজ্যের যুবসমাজ ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছে। চাকরিপ্রার্থীদের আস্থা ভেঙে পড়েছে বলেও দাবি গেরুয়া শিবিরের।
নারী নিরাপত্তা ও পঞ্চায়েত ভোটে হিংসার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে বিজেপির চার্জশিটে। দলের অভিযোগ, প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণেই একের পর এক অপরাধের ঘটনা ঘটছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে অনুপ্রবেশ ও পাচার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিজেপি। চার্জশিটের মাধ্যমে ভোটারদের সামনে প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে— রাজ্যে আদৌ কতটা নিরাপদ সাধারণ মানুষ?
তবে বিজেপির এই অভিযোগগুলিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। শাসক দলের দাবি, রাজ্যের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে লক্ষ লক্ষ মানুষ উপকৃত হয়েছেন এবং বিরোধীরা অপপ্রচার চালাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট বিধানসভা কেন্দ্র ধরে চার্জশিট প্রকাশ করে রাজ্যে নিজেদের রাজনৈতিক জমি আরও চওড়া করতে চাইছে বিজেপি। দুর্নীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা ও নারী নিরাপত্তা— এই বিষয়গুলিই এখন রাজ্য রাজনীতির মূল আলোচনার কেন্দ্রে। চার্জশিটের প্রভাব ভোটের ফলাফলে কতটা পড়বে, তা ভবিষ্যৎই বলবে, তবে নির্বাচনী লড়াই যে আরও তীব্র হচ্ছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।







