একটি বর্ণময় অধ্যায়ের শেষ। ২১ বছরের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে দুশোরও বেশি ম্যাচ খেলে ১২৫টি গোল এবং ৬৮টি অ্যাসিস্ট করেছেন লিওনেল মেসি। গত ৩১ অগস্ট আর্জেন্তিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের কথা ঘোষণা করেছেন মহাতারকা। বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে হারই কি তাঁর বিদায়ের অন্যতম কারণ? অনেকেই সেই সম্ভাবনাই দেখছেন। তার আগে অবশ্য ১৫ জুলাই আটলান্টায় ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে মহাকাব্যিক জয় পেয়েছিল আর্জেন্তিনা। ৩৯ বছর বয়সেও মেসির মাঠের দাপট দেখে এক বর্ষীয়ান সাংবাদিকের চোখে জল চলে এসেছিল। সব মিলিয়ে শেষ হয়েছে এক অসাধারণ ফুটবল-অধ্যায়।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মেসির পর আর্জেন্তিনার ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সি কার গায়ে উঠবে?
দেশের ফুটবলমহলে অবশ্য দাবি উঠেছিল, মেসিকে সম্মান জানাতে ১০ নম্বর জার্সিই তুলে রাখা হোক। কিন্তু ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, কোনও জার্সি স্থায়ীভাবে অবসর দেওয়া সম্ভব নয়। দিয়েগো মারাদোনার পর এই নম্বরের জার্সি পরেছেন পাবলো আইমার, আরিয়েল ওর্তেগা, জুয়ান রোমান রিকেলমের মতো তারকারা। ২০০৯ সাল থেকে সেই জার্সির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন মেসি। এবার তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন।
সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে ২২ বছর বয়সি নিকো পাজের নাম। ইতালির ক্লাব কোমোর এই বাঁ-পায়ের মিডফিল্ডারকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা। তাঁর খেলার মধ্যে অনেকেই প্রাক্তন আর্জেন্তাইন তারকা ফার্নান্দো রেদন্দোর ছায়া দেখতে পান। তবে মেসির জায়গা পূরণ করা যে মোটেই সহজ নয়, তা বলাই বাহুল্য। কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং আর্জেন্তিনা ফুটবল সংস্থার সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ। এক সময়ের শান্ত-লাজুক মেসি বছরের পর বছর ধরে নিজেকে বদলে হয়ে উঠেছিলেন তীব্র লড়াকু এবং আগ্রাসী নেতা। তাঁর সেই ভূমিকার বিকল্প খুঁজে পাওয়া কার্যত অসম্ভব।
শুধু ১০ নম্বর জার্সিই নয়, মেসির পর দলের নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২৮ বছর বয়সি ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো অধিনায়কত্বের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। বর্তমানে আতলেতিকো মাদ্রিদের হয়ে খেলছেন তিনি।
অন্যদিকে, আর্জেন্তিনার সোনালি প্রজন্মের একাধিক তারকার কেরিয়ারও শেষের দিকে এগোচ্ছে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, নিকোলাস ওটামেন্ডি, রদ্রিগো ডি পল এবং লাউতারো মার্তিনেজদের মতো ফুটবলাররাও ধীরে ধীরে কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছেন। সম্প্রতি নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে দলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনিও কার্যত একই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দল এখন ‘শেষ পর্যায়ে’ পৌঁছে গিয়েছে।
২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্তিনা ফুটবল সংস্থার আর্থিক অবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আসে। মেসির বিপুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকান এক্সপ্রেস, ম্যাকডোনাল্ডসের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে স্পনসর হিসেবে পাশে পায় তারা। মধ্যপ্রাচ্য এবং চিনেও একাধিক বড় আর্থিক চুক্তি হয়। ফলে মেসি-পরবর্তী সময়েও মাঠের পাশাপাশি বাণিজ্যিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাটা আর্জেন্তিনা ফুটবলের কাছে বড় পরীক্ষা।
এর মধ্যেই ব্যক্তিগত জীবনেও গভীর শোকের মুখোমুখি হয়েছেন মেসি। গত ৮ অগস্ট ৬৮ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন তাঁর বাবা জর্জ মেসি। সেই শোক নিয়েই বিশ্বকাপে মাঠে নেমেছিলেন লিও। আগামী ৬ অক্টোবর রিভার প্লেটের এস্তাদিও মনুমেন্টালে বেনিনের বিরুদ্ধে দেশের জার্সিতে শেষবার মাঠে নামতে পারেন তিনি। তড়িঘড়ি করে আয়োজন করা এই বিদায়ী ম্যাচই যেন স্পষ্ট করে দিচ্ছে—মেসির প্রস্থান আর্জেন্তিনা ফুটবলে কতটা বড় শূন্যতা তৈরি করেছে।







