বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম প্রেমের উপন্যাস সৃষ্টি করে ছিলেন সাহিত্যিক শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় । তাঁর এই অনবদ্য রচনা কে এক নতুন রূপে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছে সিরিজের মাধ্যমে। যেখানে পুরাতনের সাথে আধুনিকতার মিলন ঘটাতে চেয়েছে অদিতি রায় ।
বাঙালি বাড়িতে কিশোর – কিশোরী বয়সে প্রথম প্রেমের অনুভূতি জরিয়ে নিয়েছে দুই প্রতিবেশী অসমবয়সী প্রেম । যা এই সিরিজে খুব নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
তবে বহু পুরাতন পরিচিত কাহিনীকে অচেনা দৃষ্টি ভঙ্গিতে দেখাতে চেয়েছেন পরিচালক । যেখানে তার মূল গল্পকে সহজ-সরলতা , স্নিগ্ধতাকে বজায় রেখেছে আপাদমস্তক ,এখানেই পরিচালকের মুন্সীয়ানা প্রকাশ পায়।
অদিতির ‘ পরিনীতা ‘ মূল গল্পের শুর হয় শেষ থেকে । তবে এখানে দেখানো হয়েছে ১৯০৮ সালে এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে শেখর (গৌরব চক্রবর্তী) ও ললিতা (দেবচন্দ্রিমা সিংহরায়) কে মুঙ্গের স্টেশনের ওয়েটিং রুমে ।সেখানে দেখা যায়, আটকে পড়া তাদের স্মৃতি আগলা হয়ে খুলে যেতে। যা টুকরো টুকরো করে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয় , যার মাধ্যমে দুজনের অতীতের সমন্ধে জানা যায়।
কী ভাবে এক ধনী প্রতিবেশী নবীন রায়ের (লোকনাথ দে) ছেলে শেখরের সঙ্গে , তার মামা গুরুচরণের (দেবদূত ঘোষ) আশ্রয়ে থাকা অনাথ ললিতা (দেবচন্দ্রিমা সিংহরায়)বাঁধা পড়েছিল এক অসমাপ্ত প্রেমে । সেখান থেকে কী করে গুরুচরণের পরিবারের ভরসা হয়ে ওঠে , গিরীনের (অর্পণ ঘোষাল) সঙ্গে ললিতার বন্ধুত্ব। সেখান থেকে হিংসেয় জ্বলেপুড়ে তার সঙ্গে মালাবদল শেখরের । তাহলে কেনই বা সে দূরে ঠেলে দিয়েছিল ললিতাকে, অবশেষে ভুল বোঝাবুঝি মিটে কী করে এক হল দু’জনে, এই বিষয় নিয়েই এগিয়েছে সিরিজের গল্প।
এই সিরিজে বারবার উঠে এসেছে স্বদেশী আন্দোলন ,দেশভাগের আগুনে সময় ,ব্রাহ্মসমাজ বনাম গোঁড়া হিন্দুদের লড়াই। এই গল্পে ঘর- বাড়ি থেকে শুরু করে চরিত্রদের পোশাক-আশাক, সবেতেই আটপৌরে আমেজ মন কাড়ে। তবে গানের ব্যবহার ভাল লাগলে ও সংখ্যায় একটু কম করলে ভাল হত।
শেখর চরিত্রের টানাপোড়েন গুলোতে প্রান ঢেলেছেন গৌরব । সেক্ষেত্রে ললিতার চরিত্রে দেবচন্দ্রিমাকে খানিকটা আড়ষ্ট লাগলেও , তাঁর অভিনয় আর সেকেলের বাংলা উচ্চারণ এছাড়াও তাঁর চেহারার স্নিগ্ধতা গল্পের ললিতার সঙ্গে অনেকটাই মিলে যাওয়ায় সে খামতি ঢাকা পড়ে যায় কিছুটা।
এছাড়া সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিতে দেবদূত, লোকনাথ কিংবা শেখরের মায়ের চরিত্রে পুষ্পিতা মুখোপাধ্যায়ের মতো বলিষ্ঠ অভিনেতাদের যদিও কিছু করার ছিল না তেমন।
সম্পূর্ণ সিরিজটা ছয়টি পর্ব রয়েছে, এই ছয় পর্বের বারবারই উঠে এসেছে শেখর আর গিরীনের চরিত্রের বৈপরীত্য। এখানে কাহিনির সময়কালে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের পুরুষের সব আচরণই সঠিক ভাবা এবং নারীকে নিয়মে-শাসনে বেঁধে পরাধীন করে রাখাই ছিল রীতি।
সেক্ষেত্রে একালের লেন্সে এ শেখরকে ‘আলফা মেল’ বলা চলে। সাহিত্য-নির্ভর পিরিয়ড ড্রামায় মূল গল্প বা তার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়া সম্ভব হয় না পরিচালকের ।
তা করা গেলে হয়তো নিজের সিদ্ধান্ত বা পছন্দকে গুরুত্ব দিতে চাওয়া ললিতার পাশে শেখর নয়, ব্রাহ্মসমাজের উদারপন্থী গিরীনকেই যেন অনেক বেশি মানাত!
এমনটাই জানালেন ‘পরিনীতা’র কাহিনী পথপ্রদর্শনী অদিতি রায়।







