কানসাস সিটি বরাবরই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক বিশেষ শহর। যে অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামবে আর্জেন্টিনা, সেই মাঠ বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চ শব্দসৃষ্টিকারী স্টেডিয়াম হিসেবে বহুদিন আগেই গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে জায়গা করে নিয়েছে। আশির দশকে যখন দিয়েগো মারাদোনা বিশ্ব ফুটবলে রাজত্ব করছেন, সেই সময় কানসাস সিটির ক্লাবের হয়ে খেলেছিলেন আর্জেন্টিনার আরেক বিশ্বকাপজয়ী তারকা ওসভাল্ডো আর্দিলেস। সেই শহরেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় ভরপুর কমপাস মিনারেলস পারফরম্যান্স প্যাভিলিয়নকে বেসক্যাম্প হিসেবে বেছে নিয়েছে আর্জেন্টিনা দল। ক্রীড়া বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক ব্যবস্থাই রয়েছে সেখানে।
সম্প্রতি ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলতে গিয়ে হ্যামস্ট্রিংয়ে অস্বস্তি অনুভব করে মাঠ ছাড়েন লিওনেল মেসি। সেই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মনে দুশ্চিন্তার ছায়া নেমে এসেছিল। তার ওপর হন্ডুরাসের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে কোচ লিওনেল স্কালোনি তাঁকে বেঞ্চেও না রাখায় উদ্বেগ আরও বেড়েছিল। অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন, চার বছর আগের মতো আবারও কি চোট সমস্যায় পড়তে চলেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক?
তবে কানসাসে থাকা আর্জেন্টাইন সাংবাদিকদের খবর বলছে, সেই সব আশঙ্কার আর কোনও ভিত্তি নেই। মেসি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে অনুশীলনে ফিরেছেন এবং আগের মতোই দৌড়ঝাঁপ করছেন। ফলে বুধবার ভারতীয় সময় ভোর সাড়ে ছ’টায় আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে শুরু থেকেই তাঁকে মাঠে দেখা যাবে, তা প্রায় নিশ্চিত।
চোটমুক্ত মেসি যে কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারেন, তা ফুটবল বিশ্ব বহুবার দেখেছে। কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পর তাঁর কাছে ট্রফির সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে খেলাটার আনন্দই এখন সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
মেসির ক্যারিয়ারে পরিসংখ্যান মানেই নতুন ইতিহাস। আইসল্যান্ডের বিরুদ্ধে গোল করে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করার রেকর্ড গড়েছেন। যে বয়সে অনেক ফুটবলার অবসর নিয়ে কোচিং বা ধারাভাষ্যের জগতে পা রাখেন, সেই বয়সেই মেসি বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নামলেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বাধিক ম্যাচে অধিনায়কত্ব করার নজির গড়বেন তিনি। সেই তালিকায় পিছনে পড়ে যাবেন দিয়েগো মারাদোনা। ধীরে ধীরে নিজের আলাদা উত্তরাধিকার তৈরি করেছেন মেসি, যেখানে তিনিই কেন্দ্রবিন্দু।
প্রথম ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা শিবিরে আরও একটি সুখবর এসেছে। চোটে ভোগা একাধিক ফুটবলার ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে অনুশীলনে ফিরেছেন। হুলিয়ান আলভারেজ, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, নিকো পাজ, নিকো গঞ্জালেস, নাহুয়েল মোলিনা এবং গঞ্জালো মনতিয়েল এখন দলের সঙ্গে নিয়মিত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সবচেয়ে বড় স্বস্তি অবশ্য গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে ঘিরে। জানা যাচ্ছে, প্রথম ম্যাচেই তিনি গোলপোস্টের নিচে দাঁড়াবেন।
সব কিছু ইতিবাচক হলেও কোচ স্কালোনির কিছুটা চিন্তা রয়েছে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে নিয়ে। তিনি এখনও পুরোপুরি দলের সঙ্গে অনুশীলন করতে পারছেন না। ফলে প্রথম ম্যাচে তাঁর খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
তাগলিয়াফিকোর সম্ভাব্য অনুপস্থিতি এবং মোলিনা-মনতিয়েলের প্রত্যাবর্তনের কারণে রক্ষণভাগ সাজাতে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে কোচকে। তবে আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণভাগে লিওনেল মেসি ও লাউতারো মার্টিনেজের জুটি দেখা যাবে। মাঝমাঠে থাকবেন রদ্রিগো দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ এবং আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। সবচেয়ে বড় চমক হতে পারে রক্ষণভাগে। ডান প্রান্তে গিউলিয়ানো সিমিওনে এবং বাঁ প্রান্তে লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন স্কালোনি। আর সেন্ট্রাল ডিফেন্সে থাকবেন ক্রিস্টিয়ান ‘কুটি’ রোমেরো ও অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দি।
বিশ্বকাপের লড়াই শুরুর আগে আর্জেন্টিনার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আমেরিকার তীব্র গরম আবহাওয়া। তবে দলীয় ম্যানেজমেন্ট সেই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে আগেভাগেই পরিকল্পনা করেছে। প্রথম কয়েকদিন ইচ্ছাকৃতভাবেই রোদের মধ্যে অনুশীলন করানো হয়েছে ফুটবলারদের, যাতে ম্যাচের সময় আবহাওয়ার প্রভাব যতটা সম্ভব কমানো যায়।






