সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংবাদমাধ্যম—এই মুহূর্তে সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রে এক নাম, নিম করোলি বাবা। সদ্য মুক্তি পাওয়া ‘হনুমান অংশ’ সিনেমার সাফল্যের পর ছবিটি নিয়ে যেমন চর্চা শুরু হয়েছে, তেমনই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে নিম করোলি বাবার জীবন ও আধ্যাত্মিক ভাবধারা।
বিশাল চতুর্বেদীর পরিচালনায় মাত্র ২ কোটি টাকা বাজেটে তৈরি এই ছবি ইতিমধ্যেই বক্স অফিসে ১৩০ কোটি টাকারও বেশি ব্যবসা করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ‘ধুরন্ধর’ এবং ‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর মতো ছবির পরিচালক আদিত্য ধর থেকে অভিনেতা বরুণ ধাওয়ান—একাধিক তারকাই সিনেমাটির প্রশংসা করেছেন। আর সেই সূত্রেই ফের সামনে এসেছে নিম করোলি বাবাকে ঘিরে থাকা নানা কাহিনি ও বিশ্বাস। কিন্তু কে ছিলেন এই সাধক?
১৯০০ সালে উত্তরপ্রদেশের আকবরপুর গ্রামে জন্ম নিম করোলি বাবার। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল লক্ষ্মণ নারায়ণ শর্মা। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি সাধকের জীবন বেছে নিয়েছিলেন। হিন্দু আধ্যাত্মিক গুরু এবং হনুমানজির একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবেই তিনি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। জীবনের একটা পর্যায়ে সন্ন্যাসী জীবন কাটালেও পরবর্তীতে তিনি সংসার জীবনেও ফিরে আসেন। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর শিক্ষা, দর্শন এবং আধ্যাত্মিক ভাবনা ভক্তদের মধ্যে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। তাঁকে ঘিরে বহু অলৌকিক ও কিংবদন্তি কাহিনিও প্রচলিত রয়েছে। ভক্তদের একাংশের বিশ্বাস, অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে দেওয়ার মতো ক্ষমতাও ছিল তাঁর। তবে এই ধরনের ঘটনাগুলি মূলত ভক্তদের বিশ্বাস ও প্রচলিত কাহিনির অংশ। তাই সেগুলিকে প্রামাণ্য ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
নিম করোলি বাবার জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে উত্তরাখণ্ডের কাঁচি ধাম। ১৯৬২ সালে কুমায়ুন অঞ্চলে তিনি এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঁচি ধাম হয়ে ওঠে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাধনাস্থল এবং ভক্তদের কাছে এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। প্রতি বছর ১৫ জুন আশ্রম প্রতিষ্ঠার দিন সেখানে বহু মানুষ সমবেত হন।
তবে নিম করোলি বাবাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিশ্বাসগুলির একটি হল হনুমানজির সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক। হনুমানের প্রতি তাঁর অসীম ভক্তি ও শ্রদ্ধা দেখে বহু অনুগামী তাঁকে হনুমানের আশীর্বাদধন্য বা বরপুত্র বলে মনে করেন। ‘হনুমান অংশ’ সিনেমাতেও এই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে।
নিম করোলি বাবার অন্যতম উল্লেখযোগ্য শিষ্য ছিলেন মার্কিন আধ্যাত্মিক গুরু রাম দাস। তাঁর আসল নাম রিচার্ড অ্যালপার্ট। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক রিচার্ড অ্যালপার্ট ভারতে এসে নিম করোলি বাবার সংস্পর্শে আসেন। সেই সাক্ষাৎ তাঁর জীবনের গতিপথই বদলে দেয়। পরবর্তীতে তাঁর লেখা বিখ্যাত বই ‘Be Here Now’ প্রকাশিত হয়। বইটির মাধ্যমে পাশ্চাত্য দুনিয়ায় নিম করোলি বাবার দর্শন ও ভাবধারা আরও পরিচিত হয়ে ওঠে।
নিম করোলি বাবাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহ কম ছিল না। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, স্টিভ জবসও একসময় ভারতে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু জবস ভারতে আসার আগেই ১৯৭৩ সালে বাবার মৃত্যু হয়। তবে স্টিভ জবস কাঁচি ধামে গিয়েছিলেন এবং সেখানে কিছুটা সময় কাটিয়েছিলেন বলে জানা যায়। এছাড়াও হলিউড অভিনেত্রী জুলিয়া রবার্টস এবং ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গের সঙ্গেও নিম করোলি বাবার দর্শনের যোগসূত্র নিয়ে বহু আলোচনা রয়েছে।
ফলে একটি সিনেমার সাফল্যকে কেন্দ্র করেই কয়েক দশক পর ফের জনচর্চার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন হনুমানভক্ত নিম করোলি বাবা। তাঁর জীবন, দর্শন এবং তাঁকে ঘিরে থাকা নানা কিংবদন্তিই এখন নতুন করে কৌতূহল তৈরি করছে মানুষের মধ্যে।







