জেলা

আগের মতন আর জৌলুস নেই , কিন্তু প্রাচীন রীতি মেনে ১৫৯ বছর ধরে প্রথা মেনে পুজিত হয়ে আসছেনা উমা

জমিদারি আর নেই । কালের নিয়মে উঠে গিয়েছে জমিদারি রাজ পাঠ। কিন্তু রয়ে গিয়েছে জমিদারি আমলের বৈঠকখানা, ঘর দালান থেকে শুরু করে জমিদারি আমলেআর লোহার সিন্দুক।কালের নিয়মে জমিদারি প্রথার অবসানের সঙ্গে সিংহদুয়ারে দারোয়ানও আজ নেই ৷ মণ্ডলদের জমিদার বাড়ির দুর্গা পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় জন্মাষ্টমীর দিন থেকে ৷ ওইদিন গঙ্গা মাটি দিয়ে দেবীর কাঠামোর পুজো হয় ৷ মহালয়ার আগে কাঠামোতে খড় বাঁধা, মাটি দেওয়া-সহ সব কাজ শেষ করে ফেলা হয় ৷ মহালয়ার দিন দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হয় ৷ নিয়ম মেনে এই প্রথা চলে আসছে ৷ এই মণ্ডল বাড়ির পুজোয় বংশ-পরম্পরায় প্রতিমা তৈরি করে আসছেন মৃৎ শিল্পীরা ৷ ঢাকিরাও বংশ পরম্পরায় ঢাক বাজান এই পুজোতে ৷ পুরোহিতের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম চলে আসছে ৷তৎকালীন বাংলার নবাব ছিলেন হুসেন শাহ ৷ অবিভক্ত বাংলার নবাব থাকাকালীন লবণ ও তাঁতের ব্যবসার রমরমা ছিল ৷ ডায়মন্ডহারবার শহরের নাম ছিল তৎকালীন হাজিপুর। বারদ্রোণ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন অযোধ্যা রাম মণ্ডল ৷ তিনি ওই লবণ ও তাঁতের ব্যবসা করে প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক হন ৷ ব্যবসার টাকায় বারদ্রোণ, মন্দিরবাজার, ঘটকপুর, হটুগঞ্জ, পাথরপ্রতিমা, রায়দিঘি, মথুরাপুর, নামখানা-সহ একাধিক এলাকায় জমিদারি শুরু করেন ৷ সেই অযোধ্যা রামের বংশধর ছিলেন জমিদার গোলকচন্দ্র মণ্ডল ৷ তিনিই ১৮৬৬ সালে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন ৷১৮৬৬ সালে ডায়মন্ডহারবারের তৎকালীন হাজিপুরের বারদ্রোণ গ্রামের দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন জমিদার গোলকচন্দ্র মণ্ডল ৷ এ বছর সেই পুজো ১৫৯বছরে পড়ল ৷ আগের মতো জাঁকজমক না হলেও, নিয়ম মেনে দেবীর আরাধনা করেন মণ্ডল বাড়ির সদস্যরা ৷ বিশুদ্ধ নন্দীকেশ্বর রীতি মেনে পুজো হয় দেবী দুর্গার ৷ আগে এই পুজোয় নবমীতে পাঁঠা বলি এবং অষ্টমীর সন্ধি পুজোয় গুলি ছোড়ার রীতি ছিল ৷ জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির সঙ্গেই সেই সব রীতিও বন্ধ হয়ে গিয়েছে ৷বারদ্রোণের জমিদার বাড়িতে সুবিশাল দালান বাড়ি তৈরি করেন তিনি ৷ অতীতে মণ্ডলদের জমিদার বাড়িতে পুজোর ৪দিন গ্রামবাসীদের মনোরঞ্জনের জন্য কবি গানের আসর বসত ৷ মহাসপ্তমীতে এলাকায় ব্রাহ্মণ ভোজন ও মহানবমীতে কুমারী পুজোর চল ছিল ৷ কুমারী পুজো হলেও, বন্ধ হয়ে গিয়েছে ব্রাহ্মণ ভোজনের রীতি ৷ জমিদারি থাকাকালীন মহানবমীতে পাঁঠা বলির রেওয়াজ ছিল ৷ আর প্রতিদিনই গ্রামবাসীদের ভোজনের ব্যবস্থা করা হত জমিদার বাড়িতে ৷ জমিদার বাড়ির সামনে সুবিশাল সিংহদুয়ার রয়েছে ৷ জমিদারি প্রথায় সেই সিংহদুয়ারে দিনরাত পাহারায় থাকতেন দু’জন দারোয়ান ৷ জানা যায়, সেই সময় বন্দুকের গুলির আওয়াজে শুরু হত সন্ধিপুজো ৷ বর্তমানে সেই প্রথাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে ৷ঘরের পুরু দেওয়ালে ছিল রকমারি সব কারুকাজ । সমগ্র বাড়িতে ছিল ৩৩ টি কক্ষ । দারোয়ান, জমিদারের পালকি বাহকদের জন্যও আলাদা ঘরের ব্যবস্থা ছিল । কাছারিবাড়ির মূল প্রবেশপথের উঁচু তোরণের উপরে দু’পাশে মুখোমুখি দুটি সিংহমূর্তি । আর ফটকের ঠিক উপরে সিদ্ধিদাতা গণেশের মূর্তি । সদর দরজার পূর্বদিকে লম্বা বারান্দা । জমিদারের কাছারিবাড়িতে ঢোকার মূল ফটকের দু’দিকে থাকত গাদা বন্দুকধারী দুই দারোয়ান । জমিদার বাড়িতে টাকাপয়সা ও সোনাদানা রাখার জন্য ছিল বড় বড় চারটি লোহার সিন্দুক । ওই সিন্দুকের পাশে রাখা থাকত কাতান । ডাকাতির সময় যাতে ওই কাতান সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার করতে পারা যায় । সে এক রূপকথার গল্প । আজও জমিদার বাড়ির সেসব চিহ্নের কিছু কিছু অবশিষ্ট রয়েছে ।পরিবারের সদস্যদের অনেকেই এখন কর্মসূত্রে দেশবিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকেন । পুজোর সময় দালানবাড়িতে নিয়ম করে আসতেন সকলেই । কিন্তু করোনার কারণে গত বছর পুজোর চারদিন মণ্ডল বাড়ির সেই মিলনমেলায় পরিবারের সদস্যদের অনেকেই অনুপস্থিত ছিলেন । এ বছর যদিও বাড়ির পুজোয় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে অনেকেরই । প্রতিবছর পূজো উপলক্ষে মণ্ডল পরিবারের পক্ষ থেকে একটি করে পত্রিকা প্রকাশিত করা হয় । এই পত্রিকার মাধ্যমে গ্রামবাসীদের পুজোর নির্ঘণ্ট ছাড়াও পুজোর ইতিহাস লেখা থাকে ।বিকাশ মণ্ডল জানান, আগে সন্ধিপুজোর সময় তিনি বাড়িতে গানফায়ার দেখেছেন । দেখেছেন পাঁঠাবলিও । কিন্তু পঞ্চাশের দশক থেকে পাঁঠাবলিও বন্ধ হয়েছে । পরিবারের মহিলা সদস্য চিত্রা মণ্ডলের কথায়, অতীতের সেই জৌলুস ফিকে হলেও এখনও প্রাচীন রীতিনীতি মেনে মণ্ডল বাড়ির পুজোর চলে আসছে । পুজোর চারটে দিন পরিবারের মহিলাদের কার্যত ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে কাটে । নৈমিত্তিক থেকে শুরু করে বিজয় দশমী পর্যন্ত চূড়ান্ত ব্যস্ততার মধ্যে থাকেন তাঁরা । বিজয় দশমীর দিন মায়ের বরণ করার সময় এই পরিবারের মহিলা সদস্যরা কেঁদে ফেলেন ৷ কিন্তু আসছে বছর আবার হবে এই আশায় বুক বেঁধে মাকে বিদায় জানানো হয় ।পরিবারের সদস্য নচিকেতা মণ্ডল জানান,জমিদারি প্রথার ধীরে উঠে গিয়েছে এরপর পঞ্চাশের দশক থেকে বন্ধ হয়ে যায় পাঁঠা বলি ৷ এখন শুধু নিয়মরক্ষার পুজো হয় ৷ এই পুজোর বিশেষত্ব হচ্ছে, বিশুদ্ধ নন্দীকেশ্বর মতে এই পুজো করা হয় ৷ সপ্তমীর দিন যে হোম-অগ্নি জ্বলে, তা নেভানো হয় দশমীর দিন ৷ বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা এই পুজোর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে। অতীতের সেই হারানোর জৌলুস ফিরে পেতে চেষ্টা চালাচ্ছে মন্ডল বাড়ির বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা। এ বিষয়ে অভিক মন্ডল তিনি বলেন, অতীতের যে প্রথা চলতো সেই প্রথা এখন আর নেই কিন্তু সেই অতীতের হারানো গৌরব আমরা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছি। কালের নিয়মে অতীতের অনেক কিছুই আমরা হারিয়েছি কিন্তু অতীতের সেই প্রাচীন রীতিনীতি আমরা এখনো ভুলিনি, আমরা আমাদের প্রবীণ প্রজন্মের কাছ থেকে অতীতের সমস্ত প্রাচীন রীতিনীতি শিখছি এবং জানছি। আগামী দিনে বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা মন্ডল বাড়ির যে হারানো গৌরব। সেই গৌরব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাবো। আমরা এখন থেকে ই পূজোর নানারকম কাজে হাত লাগাই। বিদেশে যে সকল আমাদের আত্মীয়-স্বজন আছে তাদেরকেও আমরা নিমন্ত্রিত করি এবং তারাও আছে। সব মিলিয়ে হইহুল্লোড়ের মধ্যে পুজোর যে পাঁচটা দিন কখন কেটে যায় আমরা বুঝতে পারি না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Adblock Detected

Please Turn Off Your Ad Blocker.