আজ বাংলার গ্রামে গ্রামে চলছে গাজনের উৎসব, গান বাজনা, মেলা যাত্রায় মুখর চারিদিক। অতীতে এবং আজও এই উৎসব ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক সীমানায় বাঁধা থাকেনি। গাজনের গান বেঁধেছেন যাত্রা পালায় অংশ নিয়েছেন এবং আজও নিচ্ছেন উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ, গ্রাম উজিয়ে হাজার হাজার মানুষ মেলাতে এসেছেন, ভিড় জমিয়েছেন যাত্রা বা গানের আসরে। ‘গাজন’, দূরত্ব দূর করার উৎসব, অবরোধ ভেঙে ফেলার হাঁক, সম-সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস।

‘গাজন ‘শব্দটি ‘গর্জন ‘শব্দ থেকে এসেছে বলে পণ্ডিতেরা বলেন। এই উৎসবে অংশগ্রহণকারী সন্ন্যাসীরা প্রচণ্ড গর্জন করে শিব-শিবানীর নাম উচ্চারণ করে, সঙ্গে শিঙায় ফুঁ, ঢাকঢোল জগঝম্প আর ডুগডুগির আওয়াজ, লোকজনের মুর্হুমুহ ‘শিব’-নামে বুক ফাটানো ডাক। ফলে উৎসবের নাম ‘গর্জন’, তার থেকেই গাজন।

আর একটা মত হলো, ‘গাঁ’ শব্দের অর্থ গ্রাম এবং
‘জন’ অর্থ জনসাধারণ; গ্রামীণ জনসাধারণের উৎসব হওয়ায় এর নাম ‘গাঁজন’ বা ‘গাজন’। একথা, ভাষাবিদ সুকুমার সেন শব্দের উৎপত্তি নির্ণয় করতে গিয়ে বলেছেন। গাজনের সঙ্গে ‘জনগণ’-এর খুব মিল। তাই বছর শেষের চৈত্র সংক্রান্তির এই পার্বন জনগণের পার্বন।
মালদা, রাজশাহী, দিনাজপুর সহ উত্তর বঙ্গের একটা বড়ো অংশে এই একই উৎসব ‘গম্ভীরা’ নামে পরিচিত। যাঁরা শিবের অষ্টোত্তর শতনাম পড়েছেন তাঁরা জানেন শিবের আর এক নাম ‘গম্ভীর’, তার থেকেই গম্ভীরা গান, গম্ভীরা উৎসব।
এই লোক উৎসবে সমাজের উঁচুতলার নাকউঁচু মানুষ আর ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের একচেটিয়া শাসন ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে সাধারণ প্রান্তিক মানুষ আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। উৎসবের নিয়ম তারা নিজেরাই গড়ে, নিজেরাই ভাঙে, গান বাঁধে, গান গায়, যাত্রাপালার অনুষ্ঠান করে। বিনয় ঘোষ তাঁর সমাজতাত্ত্বিক ব্যখ্যায় কামার, কুমোর, তাঁতি, জেলে, জোলা , নিম্নবর্ণের মানুষদের এই সাংস্কৃতিক অভ্যুত্থানকে অন্য মাত্রা এবং মর্যাদায় ব্যাখ্যা করেছেন।
গাজনের দিনে দেবী হরকালীর সঙ্গে শিবের বা শিব-শিবানীর বিয়ে হয়। বিয়েতে সন্ন্যাসীরা, গাঁ-জনেরা বরযাত্রী । যে শিবকে সারা বছর আগলে রাখেন ব্রাহ্মণেরা, গাজনের ক’দিন সেই শিব ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রণ ও মন্দির মুক্ত হয়ে সমাজের নিম্ন কোটির মানুষের ভালোবাসায় ভেসে যান, তাদের হাতে পুজো নেন। পুজোর উপচার খুব সাধারণ…ধুঁতরো আর আকন্দের ফুল, সঙ্গে জল বাতাসা। এখানে কোনও ভেদাভেদ নেই, জাত নেই, কুল নেই, উচ্চবর্ণের অবজ্ঞা অবহেলা নেই। গাজন, অনার্যদের উন্মুক্ত সংসারে বিধি-বাধনহীন স্বাধীনতায় শিব-শিবানীর বিয়ের বাসর। গাজনের সময় শিব প্রকৃত অর্থে “গণদেবতা”। এই কারণেই ছোটোবেলা থেকে ‘গাজনের মেলা’ আমায় আকর্ষণ করে।

উপবাসী সন্ন্যাসীরা গোটা চৈত্রমাস কৃচ্ছসাধনের পর যে আত্মশক্তি অর্জন করে তাকে সম্বল করেই চড়ক সংক্রান্তিতে নানা শারীরিক কৃৎকৌশল দেখায়, যাকে অনেকে অলৌকিক আখ্যা দিয়ে থাকেন। সঙ্গে ‘সঙের গান’ যার জন্যে বিশেষ মঞ্চ বা আলোকসজ্জার দরকার হয় না। সবই সাধারণ, চাকচিক্যহীন, আটপৌরে, কিন্তু আন্তরিকতায় আর্দ্র অনার্যদের অবকাশ যাপনের উপায়।

সভ্যাতা এগোনোর সাথে সাথে গ্ৰাম সমাজে ভাঙন এসেছে, মানুষ শহরমুখী হয়েছে, উৎসব-আয়োজন, পূজা-পার্বনের চেহারায় নিরন্তর বদল আসছে। গ্ৰাম বাংলার গভীরে চড়ক সংক্রান্তি ও গাজনের অনুষ্ঠানের চল এখনও থাকলেও তার রূপ ও বৈচিত্র্যে আগের আন্তরিকতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা আর নেই। নাগরিক সভ্যতা লৌকিক জীবনকে গ্ৰাস করে নিতে উদ্যত হয়েছে। তবু গাজন আজও সারা বছরের ম্লান অভিজ্ঞতার স্মৃতি মুছে, যাপিত জীবনের ধুলো ঝেড়ে ,গাঁ জনের ঘরে ঘরে উৎসবের দীপ জ্বেলে যায়। স্বাগত কালের কন্ঠস্বরকে।







