ফিরে দেখা কালজয়ী পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ১০২তম জন্মদিন আজ (২ মে, ২০২৩)। এই বিশেষ দিনে বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়ির দরজা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। অস্কারজয়ী পরিচালককে জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রায় বাড়িতে হাজির হন বহুজন। ২০২২ সালে করোনার প্রভাব থাকায় দূরত্ববিধি মেনে ঘরোয়াভাবে সত্যজিতকে কুর্নিশ জানানো হয়েছিল। একতলায় সত্যজিৎ রায়ের ছবি ফুলের মালা দিয়ে সাজানো হয়েছিল। তবে এ বছর আবার পুরনো মেজাজে সেজে উঠছে রায় বাড়ির অন্দরমহল। খুলে দেওয়া হয়েছে রায় বাড়ির দরজা।
অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্রে আসার আগে সিগনেট প্রেসে বইয়ের কভার ইলাস্ট্রেশনের দায়িত্বে ছিলেন। সেখানে ২ টি অসামান্য বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন করেন তিনি। তার মধ্যে একটি হল জিম করবেটের ম্যানইটারস অফ কুমায়ুন। আর অপরটি হল জওহরলাল নেহেরুর ডিসকভার অফ ইন্ডিয়া। ক্যালিগ্রাফিতে সত্যজিৎ রায়ের দক্ষতা সম্পর্কে অনেকেই অবগত। কিন্তু তাঁর হাতে তৈরি রোমান ফন্টের কথা? চারটি রোমান ফন্ট ডিজাইনের পিছনেও রয়েছে সত্যজিতের কৃতিত্ব।
ভারতীয় মোটিফ ও ক্যালিগ্রাফি দিয়ে তৈরি সেই ফন্টগুলির নাম রে রোমান, রে বিজার, ড্যাফনিস ও হলিডে স্ক্রিপ্ট। ১৯৪৮ সালেই লেখা হয়ে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস ‘ঘরে বাইরে’র চিত্রনাট্য। হরিসাধন দাশের সঙ্গে যৌথভাবে সিনেমাটি করার কথাও ছিল তাঁর। কিন্তু প্রযোজক চিত্রনাট্যের একজায়গায় পরিবর্তন করতে বলেন। তাতে সম্মত হননি সত্যজিৎ রায়। উল্লেখ্য, পথের পাঁচালিই সত্যজিৎ রায়ের প্রথম সিনেমা যা মুক্তি পাওয়ার আগে একটি টিজারের মাধ্যমে বিজ্ঞাপিত হয়। সেই সঙ্গে প্রথম ভারতে কোনও চলচ্চিত্র মুক্তির আগে তার টিজার প্রকাশিত হল। দেখতে গেলে এদিক থেকেও পথিকৃৎ ছিলেন সত্যজিৎ রায়।
সত্যজিৎ রায়ের বহু চর্চিত এবং সমাদৃত পথের পাঁচালি সিনেমার শেষে একটু ‘হ্যাপি এন্ডিং’ থাক, এমনটাই চেয়েছিলেন তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। শেষে জওহরলাল নেহেরুর মধ্যস্থতায় সিনেমাটি কান ফিল্ম ফেস্টিভালের মঞ্চে পৌঁছায়। ডিজি কিমার সংস্থার কলকাতার অফিসে কাজে ঢুকেছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেখানেই খুব অল্প সময়েই অনেক উন্নতি করেন তিনি। সেই জন্য তাঁর দ্রুত পদোন্নতিও ঘটে। আর্ট ডাইরেক্টরের পদে উন্নীত করা হয় তাঁকে।
১৯৬৪ সালে সত্যজিৎ রায় তাঁর আরও এক সফল চলচ্চিত্র ‘চারুলতা’ পরিচালনা করেন। এই সিনেমা নিয়ে তাঁর একটি কথা আজও বিখ্যাত। পরে একসময় তিনি বলেছিলেন, ‘কখনও এই সিনেমা দ্বিতীয়বার বানাতে হলে এই একইভাবে বানাব’। চারুলতা মুক্তি পাওয়ার অনেক আগেই, ১৯৬১ সালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথভাবে ছোটদের পত্রিকা ‘সন্দেশ’ সম্পাদনা শুরু করেন তিনি। এই পত্রিকা তাঁর বাবা সুকুমার রায়ের মৃত্যুর কিছুদিন পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
অন্যদিকে, আরও এক সফল চলচ্চিত্র ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সত্যজিৎ রায়ের নিজের লেখা গল্প থেকে নির্মিত হয়েছিল। উল্লেখ্য, সত্যজিৎ পরিচালিত এই চলচ্চিত্র তাঁর প্রথম রঙিন সিনেমা। আবার ৮০ দশকের দিকে, সালটা ছিল ১৯৮৭, সত্যজিৎ রায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জন্য একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। সেই তথ্যচিত্রটি ছিল তাঁর বাবা সুকুমার রায়ের উপরেই। সুকুমার রায়ের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তৈরি করা হয় সেই তথ্যচিত্র। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রথম বিনোদন জগতের যিনি ডক্টরেট পান তিনি হলেন চার্লি চ্যাপলিন। আর তারপরেই সেই তালিকায় দ্বিতীয় নাম হিসেবে যোগ হয়, বাংলার মহান চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের। শুধু নিজের সিনেমায় নয়, মার্চেন্ট আইভরি ফিল্ম ‘শেক্সপিয়ার ওয়ালা’তেও সঙ্গীত পরিচালকের কাজ করেছেন সত্যজিৎ রায়।
অর্থনীতি আর চারুকলা নিয়ে পড়লেও চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করে দিয়েছিল তাঁর বাকি জীবনের ইতিহাস।
মোট ৩২টি কাহিনিচিত্র এবং চারটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন তিনি।
উনিশশো পঞ্চান্ন সাল থেকে নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন সত্যজিৎ রায়। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য অস্কারে সত্যজিৎ রায়কে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয় ১৯৯২ সালে। একাত্তর বছর বয়সে সত্যজিৎ রায়ের জীবনাবসান ঘটে কলকাতায় ১৯৯২ সালের ২৩শে এপ্রিলে।







