ভারতীয় মহিলা হকি দলে যেন বিস্ফোরণ! খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে সরাসরি কেন্দ্রীয় ক্রীড়া মন্ত্রকে গুরুতর অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর অবশেষে পদত্যাগ করলেন প্রধান কোচ হরেন্দ্র সিং। হকি ইন্ডিয়া দায়সারাভাবে ‘ব্যক্তিগত কারণ’ দেখিয়ে কোচের সরে দাঁড়ানোর খবর দিলেও, আসল কারণ ভিন্ন। গত প্রায় ৯ মাস ধরে দলের খারাপ পারফরম্যান্স এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর ‘স্বৈরাচারী মনোভাব’ নিয়ে অসন্তোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, দলের অর্ধেকের বেশি সদস্য তাঁর অধীনে খেলতে অস্বীকার করেন।
প্যারিস অলিম্পিক কোয়ালিফায়ার এবং এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়া সিনিয়র খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে মন্ত্রকে বারবার অভিযোগ জমা পড়ার পরই হকি ইন্ডিয়া নড়েচড়ে বসে। সূত্রের খবর, খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে মন্ত্রকের কাছে এটি ছিল দ্বিতীয় অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র খেলোয়াড় জানিয়েছেন, প্রথমবার প্রায় তিন-চার মাস আগেই জাতীয় ক্যাম্পে খেলোয়াড়রা মন্ত্রকের টার্গেট অলিম্পিক পডিয়াম (TOP) বিভাগে তাঁদের উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক অভিযোগের পরই মন্ত্রক হকি ইন্ডিয়াকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ মেনে হকি ইন্ডিয়ার সভাপতি দিলীপ তিরকে এবং সাধারণ সম্পাদক ভোলা নাথ সিং সোমবার বেঙ্গালুরুর সাই (SAI) কেন্দ্রে পৌঁছান, যেখানে জাতীয় ক্যাম্প চলছিল। তাঁরা সেখানে উপস্থিত প্রতিটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেন। অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা যায়, খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলার পর হকি ইন্ডিয়ার কর্তারা বুঝতে পারেন যে দলের প্রায় অর্ধেকের বেশি সদস্য হরেন্দ্র সিংয়ের অধীনে খেলা চালিয়ে যেতে রাজি নন। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল কোচের দলের প্রতি মনোভাব, চোটের বাড়তে থাকা সংখ্যা এবং সামগ্রিক পারফরম্যান্সের নিম্নমুখী গ্রাফ। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই তাই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সপ্তাহের শুরুর দিকে, হরেন্দ্র সিং এবং তাঁর সাপোর্ট স্টাফদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ সম্বলিত একটি সইবিহীন চিঠিও প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগগুলির মধ্যে ছিল “মানসিক হয়রানি”, খেলোয়াড়দের ওপর “চরম চাপ” সৃষ্টি করা এবং “শুধু অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কের সঙ্গেই ভালো ব্যবহার করা”। যদিও হকি ইন্ডিয়ার এক কর্তা জানিয়েছেন, তাঁরা চিঠিটি হাতে পেলেও সেটির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেননি। ওই সিনিয়র খেলোয়াড়টি আরও জানান যে, গত কয়েক মাসে দলের পরিবেশ ‘খারাপ থেকে খারাপের দিকে’ গেছে। “প্রায় ১০-১১ জন খেলোয়াড়ের কোনো না কোনো চোট রয়েছে, কিন্তু তাঁদের চোট গোপন করতে বলা হয়েছিল। এছাড়াও, কিছু খেলোয়াড় কোচের মধ্যে পক্ষপাতিত্বের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন, যা দলের পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। এর ফলে দলের পারফরম্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে,” তিনি যোগ করেন।
দীর্ঘ দুই দশকের ক্যারিয়ারে একাধিকবার জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব সামলানো হরেন্দ্র সিংকে গত বছর ভারত প্যারিস অলিম্পিক্সে যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর মহিলা দলের প্রধান কোচ করা হয়েছিল। তাঁর অধীনে দল গত বছর নভেম্বরে রাজগিরে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতেছিল। কিন্তু তারপর থেকেই পারফরম্যান্সের গ্রাফ নামতে শুরু করে।২০২৪-২৫ মরসুমে এফআইএইচ প্রো লিগে ১৬টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র ২টি জিতে ভারত একেবারে শেষে ছিল এবং লিগ থেকে অবনমিত হয়। এশিয়া কাপের ফাইনালে চীনের কাছে হেরে যাওয়ায় দলটি ২০২৬ এফআইএইচ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন না করার আশঙ্কার মুখে দাঁড়িয়ে। সূত্রের খবর, হকি ইন্ডিয়া এবার টোকিও অলিম্পিক্সে ভারতকে ঐতিহাসিক চতুর্থ স্থানে নিয়ে যাওয়া ডাচ কোচ সিওর্ড মারিনে এবং অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তী রিক চার্লসওর্থকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করছে।







