নিজস্ব সংবাদদাতা: সিঙ্গুরে বুধবারের সভামঞ্চ থেকে শিল্প, সামাজিক প্রকল্প ও ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) ইস্যু—সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শিল্প প্রসঙ্গে নির্দিষ্ট দু’টি প্রকল্পের কথা তুলে ধরলেও, তাঁর প্রায় ৪০ মিনিটের বক্তৃতার বড় অংশ জুড়েই ছিল এসআইআর ঘিরে কেন্দ্র, নির্বাচন কমিশন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে চোখা অভিযোগ।
সভায় মমতা জানান, ইতিমধ্যেই সিঙ্গুরে ৮ একর জমির উপর ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠেছে সিঙ্গুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। ২৮টি প্লটের মধ্যে ২৫টিই বরাদ্দ হয়ে গিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, “কৃষিও চলবে, শিল্পও চলবে। কৃষিজমি দখল করে নয়।”
এ ছাড়াও ৭৭ একর জমিতে একটি প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে তোলার কথাও ঘোষণা করেন তিনি। মমতার দাবি, ওই প্রকল্পে অ্যামাজন ও ফ্লিপকার্ট বড় ওয়্যারহাউস গড়বে এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। প্রশাসনিক ছাড়পত্র ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
তবে এই ‘শিল্প’-এর সংজ্ঞা ও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। বিজেপি মুখপাত্র তরুণজ্যোতি তিওয়ারির দাবি, এই ধরনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের স্বাক্ষরিত মউ-এর মতোই—ঘোষণার পর বাস্তবে রূপ নেয় না। সিপিএম নেতা ঐকতান দাশগুপ্তের কটাক্ষ, মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ছোট পরিসরের কাজকর্মও শিল্প হিসেবে বিবেচিত হয়, তাই এর বেশি কিছু প্রত্যাশা করাই অবান্তর।
শিল্প প্রসঙ্গের পাশাপাশি এসআইআর নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ আরও তীব্র করেন মমতা। বিবাহিত মহিলাদের পদবি ও ঠিকানা পরিবর্তনের কারণে শুনানিতে ডেকে হেনস্থা করার অভিযোগ তুলে তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্ত্রীদের কি বিয়ের পর পদবি বা ঠিকানা বদলায়নি? গোটা বিষয়টিকে ‘মহিলা-বিরোধী ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেন তিনি। ভোটের পর ফের সরকারে ফেরার দাবিও করেন মমতা। তাঁকে জেলে ভরলে বা গুলি করলেও ভয় দেখানো যাবে না—এই বার্তাও দেন মুখ্যমন্ত্রী।
সিঙ্গুরের মঞ্চ থেকেই ২০ লক্ষ মানুষের অ্যাকাউন্টে আবাস যোজনার প্রথম কিস্তির টাকা পাঠানো হয়। এর আগে ১২ লক্ষ উপভোক্তাকে এই প্রকল্পের অর্থ দেওয়া হয়েছিল। রাজ্যের দাবি, গত দেড় বছরে মোট ৩২ লক্ষ মানুষ এই প্রকল্পে উপকৃত হয়েছেন, যার ভোটের অঙ্কে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
এ দিনই বহু প্রতীক্ষিত ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। জানান, ইতিমধ্যেই ৫০০ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি এক হাজার কোটি টাকার কাজ দ্রুত শেষ হবে। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, “আমি কথা রাখি। মা-মাটি-মানুষের সরকার।”
বুধবার মমতার দিল্লি যাওয়ার কথা থাকলেও মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ারের মৃত্যুর পর সফর স্থগিত করা হয়। তবে শীঘ্রই দিল্লি গিয়ে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা স্পষ্ট করে দেন তিনি। এসআইআর ইস্যুতে আইনি লড়াইয়েও তিনি নামবেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
মোদীর সভার পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে আয়োজিত এই সভায় তৃণমূলের বড় জমায়েত চোখে পড়লেও, বিরোধীদের দাবি—প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করেই ভিড় আনা হয়েছে। তবে জাতীয় পতাকা হাতে মানুষের উপস্থিতি মোদীর সভার ছবিকেই মনে করিয়ে দিয়েছে—এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।







