প্রকৃতি বনাম মানুষের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হার মানল মানুষই। শিলিগুড়ি সংলগ্ন বৈকুণ্ঠপুর বনাঞ্চল ঘেঁষা চটকিয়াভিটার কামাতপাড়া আজ আর গ্রাম নয়—ইতিহাস। হাতির লাগাতার তাণ্ডবে ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন প্রায় ৫০টি পরিবার। যেখানে একসময় ছিল জনবসতির কোলাহল, সেখানে এখন শুধু চা-বাগানের নীরবতা আর হাতির পায়ের ছাপ।
একসময় কামাতপাড়ায় স্বাভাবিক গ্রামজীবন ছিল—চাষবাস, দৈনিক মজুরি আর ছোটখাটো কাজেই চলত সংসার। কিন্তু ২০১০ সালের পর থেকেই বদলাতে শুরু করে চেনা ছবি। বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গল থেকে রাতের পর রাত লোকালয়ে ঢুকতে শুরু করে হাতির পাল। বসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দিনের আলোতেও খাবারের খোঁজে গ্রামে ঢুকে পড়ে বন্যপ্রাণীরা।
ঘরবাড়ি ভাঙচুরের পাশাপাশি হাতির আক্রমণে প্রাণ হারান একাধিক গ্রামবাসী। ক্রমশ ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে শেষ পর্যন্ত গ্রাম ছাড়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন বাসিন্দারা। একে একে সব পরিবার চলে যাওয়ার পর কামাতপাড়া জনমানবশূন্য হয়ে পড়ে। বর্তমানে সেই জমিতে গড়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ চা-বাগান।
হাতির আতঙ্ক থেকে রেহাই পায়নি শিশুরাও। গ্রামের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কামাতপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় আজ পরিত্যক্ত। স্থানীয়দের দাবি, হাতির ভয়ে শিশুরা স্কুলমুখো হতে চাইত না। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পড়াশোনা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষা দপ্তর স্কুলটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়। জঙ্গলঘেঁষা এলাকায় পড়ে থাকা স্কুল ভবনটি আজ হারিয়ে যাওয়া গ্রামের যন্ত্রণাময় স্মৃতিচিহ্ন।
গ্রামটি বিলুপ্ত হলেও হাতির উপদ্রব থামেনি। পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে এখনও প্রায় প্রতি রাতেই হানা দিচ্ছে বন্যপ্রাণীর দল। বৈকুণ্ঠপুর বনবিভাগের ডাবগ্রাম-২ রেঞ্জের অধীন চটকিয়াভিটা বিট অফিসের বনকর্মীদের রাতভর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাতি তাড়ানোর কাজ করতে হচ্ছে।
প্রাক্তন বাসিন্দাদের কথায়,
“আজ যেখানে চা-বাগান, সেখানে একসময় আমাদের ঘর ছিল, শিশুদের হাসি ছিল। সব হারিয়ে আমরা এখন উদবাস্তু।”
জঙ্গলঘেঁষা এলাকায় মানুষ ও বন্যপ্রাণের এই সংঘাত ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। কামাতপাড়া আজ আর শুধু একটি গ্রামের নাম নয়—উত্তরবঙ্গের মানচিত্রে তা হয়ে উঠেছে বাস্তুহারা মানুষের দীর্ঘশ্বাসের প্রতীক।







