ভারত আবারও বিশ্বক্রিকেটের শিখরে। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ৯৬ রানে পরাজিত করে ইতিহাস গড়ল টিম ইন্ডিয়া। এ নিয়ে তৃতীয়বার এই শিরোপা জিতল ভারত, পাশাপাশি টানা দ্বিতীয়বারের মতো ট্রফি নিজেদের দখলে রাখল তারা। অনেকেই বলেছিলেন, টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে টানা দু’বার চ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব নয়—কিন্তু সেই সব সংশয় উড়িয়ে দিল ভারতীয় দল।
আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে এক লক্ষ বত্রিশ হাজার দর্শকের সামনে লেখা হল নতুন ইতিহাস। যে মাঠ একসময় ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় হতাশার স্মৃতি উপহার দিয়েছিল, সেখানেই এবার বিজয়ের উল্লাসে মেতে উঠল গোটা দেশ। প্রায় আড়াই বছর পর ঘুচল আহমেদাবাদের ‘অপয়া’ তকমা। গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকলেন ভারতের দুই বিশ্বজয়ী অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি ও রোহিত শর্মা।
টসে হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমেছিল ভারত। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনালের স্মৃতি অনেক সমর্থকের মনেই শঙ্কা জাগাচ্ছিল। তবে শুরু থেকেই অন্যরকম ছন্দে খেলতে দেখা গেল ভারতীয় ব্যাটারদের।
প্রথমদিকে খানিকটা সতর্ক থাকলেও দ্রুতই ছন্দ খুঁজে পান অভিষেক শর্মা। জেকব ডাফির ওভারে দুটি চার মারার পর লকি ফার্গুসনের বলে একটি বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান তিনি। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। মাত্র ১৮ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন অভিষেক। ৫২ রানে তাঁর ইনিংস শেষ হলেও ততক্ষণে ভারতের ইনিংস শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে গেছে। পাওয়ার প্লে শেষ হতে ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ৯২।
অন্যদিকে দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন সঞ্জু স্যামসন। শুরুতে ধীরস্থির থাকলেও পরে ঝড় তোলেন তিনি। ৪৬ বলে ৮৯ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলেন সঞ্জু, যার মধ্যে ছিল আটটি ছক্কা ও পাঁচটি চার। শতরানের কাছে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরি হাতছাড়া হয় তাঁর। ঈশান কিষানও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ২৫ বলে ৫৪ রান করে দলের রান তোলার গতি বাড়িয়ে দেন তিনি।
তবে ম্যাচের মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করেছিলেন জিমি নিশাম। ১৬তম ওভারে সঞ্জু, ঈশান ও সূর্যকুমার যাদবের উইকেট তুলে নিয়ে কিছুটা চাপ তৈরি করেন তিনি। শেষদিকে নিউজিল্যান্ডের বোলাররা স্লোয়ার ও কাটারের সাহায্যে রান আটকানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দেন শিবম দুবে। মাত্র ৮ বলে ২৬ রান করে ইনিংসের শেষ ওভারে ২৪ রান তুলতে সাহায্য করেন তিনি। নির্ধারিত ২০ ওভারে ভারতের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৫৫।
বিশ্বকাপ ফাইনালে এত বড় লক্ষ্য তাড়া করা যে কঠিন, তা বলাই বাহুল্য। তবু শিশির এবং সাম্প্রতিক ম্যাচগুলির অভিজ্ঞতা কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছিল ভারতীয় সমর্থকদের মনে। কিন্তু ভারতীয় বোলিং আক্রমণ শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।
জসপ্রীত বুমরাহ নিজের প্রথম ওভারেই তুলে নেন রাচীন রবীন্দ্রর উইকেট। ডিপ স্কোয়ার লেগে ঈশান কিষানের দুর্দান্ত ক্যাচে ফিরতে হয় তাঁকে। অন্যদিকে অক্ষর প্যাটেলও শুরুতেই বড় ধাক্কা দেন নিউজিল্যান্ডকে। তৃতীয় ওভারে ফিন অ্যালেন এবং পঞ্চম ওভারে গ্লেন ফিলিপসকে ফিরিয়ে দিয়ে কিউয়িদের ব্যাটিং লাইনআপে বড় ধস নামান তিনি।
পাওয়ার প্লে শেষ হতে নিউজিল্যান্ডের স্কোর দাঁড়ায় তিন উইকেটে মাত্র ৫২। বড় লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে চাপ ক্রমেই বাড়ছিল তাদের উপর। মাঝেমধ্যে কিছু সুযোগ পেলেও ভারতীয় ফিল্ডাররা অসাধারণ ক্যাচ নিয়ে ম্যাচকে একপেশে করে তোলেন। বিশেষ করে বাউন্ডারি লাইনে ঈশান কিষানের ভারসাম্য রক্ষা করে ধরা ক্যাচটি দর্শকদের মুগ্ধ করে।
নকআউট পর্বে খুব একটা ছন্দে না থাকলেও ফাইনালে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে জ্বলে ওঠেন বরুণ চক্রবর্তী। টিম সেইফার্টকে আউট করে তিনি এবারের বিশ্বকাপে সর্বাধিক উইকেট নেওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেন।
এরপর আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি নিউজিল্যান্ড। অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার কিছুটা লড়াই করলেও অন্য কেউ বড় ইনিংস গড়তে পারেননি। অক্ষর প্যাটেল তিনটি উইকেট নেন, আর বুমরাহ মাত্র ১৫ রান দিয়ে চারটি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচ কার্যত শেষ করে দেন।
এই পারফরম্যান্সের পর সীমিত ওভারের ক্রিকেটে জসপ্রীত বুমরাহকে সর্বকালের অন্যতম সেরা বোলার বলতেই পারেন অনেকেই। শেষ পর্যন্ত ৯৬ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় পায় ভারত।
নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন উৎসবের আবহ। স্লোগান, গান আর উল্লাসে মেতে ওঠেন এক লক্ষেরও বেশি দর্শক। দীর্ঘদিনের হতাশা মুছে দিয়ে এই জয় শুধু একটি ট্রফি নয়, বরং ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন আধিপত্যের ঘোষণা।
তিনবার টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের নজির এর আগে গড়তে পারেনি কোনও দেশ। টানা দু’বার জেতার রেকর্ডও নেই অন্য কারও। তার উপর দেশের মাটিতে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেল ভারত। ইতিহাস আবারও নতুন করে লিখল টিম ইন্ডিয়া।







