মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে ভারতের রান্নাঘরেও। বিভিন্ন জায়গায় এলপিজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও সঙ্কটের খবর সামনে আসতেই উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ইতিমধ্যেই দেশের বহু ক্যাফে ও রেস্তরাঁয় রান্নার গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ফলে বিকল্প জ্বালানির খোঁজে হন্যে হয়ে উঠেছেন অনেকে। কেউ মাইক্রোওয়েভ বা ইন্ডাকশন ওভেনের দিকে ঝুঁকছেন, আবার অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন পুরনো দিনের কাঠের চুলা বা মাটির উনুনে।
এই পরিস্থিতিতেই সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে আর্ট অফ লিভিং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী শ্রী রবিশঙ্করের একটি ভিডিও। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, রান্নার জন্য আর এলপিজি বা অন্য কোনও জ্বালানির প্রয়োজন হবে না—মাত্র আধ লিটার জলেই নাকি চলবে গৃহস্থের ছয় মাসের রান্না! তাঁর মতে, এই পদ্ধতিতে রান্না করা খাবার গ্যাসে রান্না করা খাবারের তুলনায় আরও বেশি পুষ্টিগুণ বজায় রাখবে।
ভিডিওতে তিনি জানান, মিঃ মহেশ নামে এক ব্যক্তির তৈরি বিশেষ ধরনের একটি স্টোভ ব্যবহার করেই সম্ভব এই কাজ। স্টোভটির সঙ্গে যুক্ত একটি ফিল্টার-জাতীয় যন্ত্রের মাধ্যমে জলের মধ্যে থাকা হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আলাদা করা হবে। আলাদা হওয়া হাইড্রোজেন গ্যাস রান্নার কাজে ব্যবহার করা হবে, আর অক্সিজেন মুক্ত হয়ে বাতাসে মিশে যাবে। ধর্মগুরুর দাবি, প্রাথমিকভাবে তাঁর আশ্রমেই এই স্টোভের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে।
স্টোভটির নির্মাতা মিঃ মহেশও ভিডিওতে নিজের আবিষ্কারের পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এলপিজি গ্যাসে রান্না করলে কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাস তৈরি হয়, যা খাবারের সঙ্গে মিশে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বার্নারের উপর সরাসরি রুটি সেঁকার সময় যে কালো পোড়া দাগ দেখা যায়, সেটিও নাকি এই গ্যাসেরই প্রভাব। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন এভাবে রান্না করা খাবার খাওয়ার ফলে শরীরে নানা রোগ, এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে এই ‘জলচালিত স্টোভ’ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে নেটমাধ্যমে। অনেকেই বলছেন, জলের হাইড্রোজেনকে আলাদা করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন, তা আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত—সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৩১৩ লক্ষ টন এলপিজি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ গৃহস্থালির রান্নার কাজে এবং বাকি অংশ হোটেল ও রেস্তরাঁয় ব্যবহৃত হয়। ফলে এত বিপুল পরিমাণ জ্বালানির বিকল্প যদি সত্যিই কোনও সহজলভ্য প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে তৈরি করা যায়, তবে তা অর্থনৈতিক দিক থেকে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকে।
তবে এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উঠে আসছে—জল। ভারত-সহ বিশ্বের বহু দেশই ইতিমধ্যে জলের সঙ্কটের মুখে পড়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর দ্রুত কমে যাওয়ার ফলে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। সেই পরিস্থিতিতে রান্নার গ্যাসের মতো বিপুল চাহিদাসম্পন্ন জ্বালানির বিকল্প যদি হয়ে ওঠে জল, তবে তা পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কী প্রভাব ফেলবে—সেই বিতর্কও এখন জোরদার হচ্ছে।
ফলে আপাতত সোশাল মিডিয়ায় এই ‘জলচালিত স্টোভ’ ঘিরে কৌতূহল ও বিতর্ক—দু’টিই সমান তালে বাড়ছে। এখন দেখার, পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর প্রমাণিত হয় এবং আদৌ বাস্তব জীবনে তা ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে কি না।







