প্রথম টেস্টে ঐতিহাসিক জয়। ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ক্রিকেটবিশ্বকে চমকে দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু অজি ক্রিকেটের আত্মসম্মানে আঘাত লাগার পর যে ভয়ঙ্কর প্রত্যাঘাত আসতে পারে, তার ইঙ্গিত ছিলই। তবে সেই পাল্টা আঘাত যে এতটা নির্মম হবে, তা বোধহয় কেউই ভাবেননি। প্রথম টেস্টের দুর্দান্ত জয়ের পর দ্বিতীয় টেস্টে কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ল বাংলাদেশ। ম্যাকেতে মাত্র দেড় দিনের মধ্যেই ম্যাচ শেষ করে দিল অস্ট্রেলিয়া। এক ইনিংস ও ৫১ রানে জয় তুলে নিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজ ১-১-এ শেষ করলেন স্টার্ক-কামিন্সরা।
দ্বিতীয় টেস্টে টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া। সকালের পিচের সুবিধা কাজে লাগিয়ে শুরু থেকেই বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন মিচেল স্টার্ক। ম্যাচের প্রথম বলেই উইকেট তুলে নিয়ে শুরুটা করেন তিনি। এরপর ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। একসময় মাত্র ২১ রানেই ৬ উইকেট হারিয়ে বসে বাংলাদেশ।
টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন স্কোর ৪৩ রান, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে। সেই লজ্জার রেকর্ডের আরও কাছে চলে গিয়েছিল টাইগাররা। শেষ দিকে তাইজুল ইসলাম ১১ এবং শরিফুল ইসলাম ১৪ রান করে কোনওরকমে দলকে সেই বিপর্যয় থেকে সামান্য রক্ষা করেন। শেষ উইকেটে তাঁদের ২৫ রানের জুটি না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৬৪ রানেই প্রথম ইনিংস শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের।
বল হাতে তখন অপ্রতিরোধ্য স্টার্ক। মাত্র ১২ রান খরচ করে ৬টি উইকেট নেন তিনি। তাঁর প্রথম পাঁচ উইকেটই আসে ম্যাচ শুরুর ২২ মিনিটের মধ্যে। প্যাট কামিন্স পান ৩টি উইকেট।
তবে বাংলাদেশের বোলিংয়েও পাল্টা জবাব ছিল। ব্যাট করতে নেমে শরিফুল ইসলামের সামনে কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। প্রথম দিনের শেষে ১৬৫ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল অজিরা। শরিফুল একাই তুলে নিয়েছিলেন ৬ উইকেট। যদিও শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস থামে ২১০ রানে। ৪৮ রান দিয়ে ৭ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের সেরা বোলার হয়ে ওঠেন শরিফুল।
প্রায় দেড়শোরও বেশি রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেও ঘুরে দাঁড়াতে পারল না বাংলাদেশ। মাত্র ৯৫ রানেই শেষ হয়ে যায় ইনিংস। স্টার্ক ফের একবার বিধ্বংসী হয়ে ৩৯ রানে ৪ উইকেট নেন। কামিন্সও মাত্র ১০ রান দিয়ে ৩টি উইকেট তুলে নেন। বাংলাদেশের ১১ জন ব্যাটারের মধ্যে মাত্র দু’জন পৌঁছতে পেরেছেন দুই অঙ্কের ঘরে। দু’জন ফিরেছেন শূন্য রানে, আরও দু’জনের সংগ্রহ মাত্র ১। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত করেন ৩১ রান, আর মুশফিকুর রহিম ২৯ রানে অপরাজিত থাকেন।
ফলে এক ইনিংস ও ৫১ রানের বড় ব্যবধানে জয় পায় অস্ট্রেলিয়া। দুই টেস্টের সিরিজ শেষ হয় ১-১ সমতায়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই ঘুরছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবিত ও মৃত’-এর বিখ্যাত লাইনকে ঘিরে তৈরি ব্যঙ্গ—‘বাংলাদেশ হারিয়া প্রমাণ করিল, প্রথম টেস্ট জয় শুধু ফ্লুক ছিল।’ কিন্তু সত্যিই কি প্রথম টেস্টের জয়কে নিছক অঘটন বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়?
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অজিদের বারবার চাপে ফেলা, ঐতিহাসিক জয় তুলে নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সিরিজ না হেরে দেশে ফেরা—এসব কি শুধুই ভাগ্যের খেলা? হয়তো দ্বিতীয় টেস্ট বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ ব্যর্থতার গল্প। কিন্তু প্রথম টেস্টের সেই ঐতিহাসিক জয় যে নিছক ‘ফ্লুক’ ছিল না, সেটাও অস্বীকার করার উপায় নেই।







