কলকাতা

কালীঘাট মন্দিরের ভল্টের চাবি কোথায়? মা কালীর গয়না-সম্পদের হিসাব নিয়ে জেলা জজের দ্বারস্থ সাবর্ণ পরিবার

কালীঘাট মন্দিরে মা কালীর নামে থাকা গয়না, ধনরত্ন এবং ভক্তদের দান করা মূল্যবান সামগ্রী বর্তমানে কোথায় রয়েছে? সেগুলির শেষ হিসাবই বা কবে হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলিই সামনে এনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা জজের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করল সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদ। পদাধিকারবলে জেলা জজই কালীঘাট মন্দির কমিটির চেয়ারম্যান।

পরিবার পরিষদের অভিযোগ, দেবীর মূল্যবান অলঙ্কার এবং অন্যান্য সম্পদ সংরক্ষণের জন্য একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে ভল্ট রয়েছে। কিন্তু ১৯৮০ সাল থেকেই সেই ভল্টের চাবি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি তাঁদের। ফলে ভল্টের ভিতরে ঠিক কী কী সম্পদ রয়েছে, সেগুলি আদৌ সুরক্ষিত কি না এবং শেষ কবে সেই সম্পদের যাচাই বা হিসাব করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এগুলি অভিযোগকারীদের বক্তব্য। অভিযোগের প্রশাসনিক বা বিচারবিভাগীয় যাচাইয়ের ফল এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায়চৌধুরীর দাবি, মন্দিরের সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য যে কমিটি তৈরি হয়েছিল, তার মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়েছে। এরপর থেকে নিয়ম মেনে নিয়মিত ভাবে মন্দিরের গয়না ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পদের হিসাব পরীক্ষা করা হয়নি বলেও অভিযোগ তাঁর।

পরিষদের আরও দাবি, এত দীর্ঘ সময় ধরে সম্পদের নিয়মিত যাচাই না হওয়ায় সেগুলি নয়ছয় হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁদের বক্তব্য, বিষয়টি শুধু আর্থিক সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ভক্তের বিশ্বাস, আস্থা এবং ধর্মীয় আবেগ।

এই পরিস্থিতিতে ভল্টের চাবি হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দ্রুত এফআইআর করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য জেলা জজের কাছে আবেদন জানিয়েছে পরিবার পরিষদ। পাশাপাশি ভল্ট খুলে সেখানে থাকা সমস্ত গয়না ও মূল্যবান সামগ্রীর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি এবং নিরপেক্ষ ভাবে সেগুলির যাচাই করার দাবিও জানানো হয়েছে।

কালীঘাট মন্দিরের পরিচালন ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদ। তাঁদের অভিযোগ, ২০১৪ সালের পর থেকে মন্দির পরিচালন কমিটির কোনও নির্বাচন হয়নি। অথচ মন্দির সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত কমিটির কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর।

নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, সেবায়েতদের মধ্য থেকে পাঁচজন প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করার কথা। পাশাপাশি মন্দিরের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, এমন ছয়জন বহিরাগত সদস্য থাকার বিধান রয়েছে কমিটিতে। আর পদাধিকারবলে জেলা জজের ওই কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার কথা।

এছাড়াও একটি বণিকসভার প্রতিনিধিকে কমিটিতে রাখার নিয়ম রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট বণিকসভার প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শিল্পকর্তার মৃত্যুর পর নতুন প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফে আর যোগাযোগ করা হয়নি।

ভক্তদের দান করা সামগ্রী সংরক্ষণ ও দেখভালের দায়িত্ব দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা প্রশাসনের উপর কলকাতা হাইকোর্ট দিয়েছিল বলেও দাবি করেছে অভিযোগকারী সংগঠন। তবে সেই নির্দেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা।

পরিষদের অভিযোগ, কালীঘাট মন্দিরে ভক্তদের হেনস্তা, দেবী দর্শনে বাধা এবং গর্ভগৃহে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশের মতো ঘটনাও ঘটছে। মন্দির পরিচালনায় নির্ধারিত নিয়মকানুন যথাযথ ভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।

কালীঘাট মন্দিরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০০৬ সালেও বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টে গড়িয়েছিল। সে সময় মন্দিরের তৎকালীন চেয়ারম্যান তথা জেলা জজ মন্দিরের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।

তখন অভিযোগ উঠেছিল, ভক্তদের দেওয়া প্রণামীর পুরো অর্থ নির্দিষ্ট জায়গায় জমা করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে পুজোর পালা বহিরাগতদের কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছিল। প্রায় ২০ বছর পর ফের ভল্টের চাবি এবং দেবীর গয়না ও সম্পদের হিসাব নিয়ে অভিযোগ ওঠায় সেই পুরনো বিতর্কই নতুন করে সামনে এসেছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন মন্দিরের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা কল্যাণ হালদারের বক্তব্য, কাউন্সিল অব সেবায়েতসই নির্বাচন পরিচালনা করে। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সম্পাদক প্রয়াত হয়েছেন এবং চেয়ারম্যান অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। এই কারণেই এতদিন নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি।

তবে তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি জেলা জজকেও জানানো হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

এখন অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা জজ কোনও তদন্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের নির্দেশ দেন কি না, সেদিকেই নজর রয়েছে। একই সঙ্গে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ বলে দাবি করা ভল্টের চাবি উদ্ধার হয় কি না এবং মা কালীর গয়না ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পদের প্রকৃত হিসাব প্রকাশ্যে আসে কি না, সেই প্রশ্নও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Adblock Detected

Please Turn Off Your Ad Blocker.