চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ের সীমা ছাড়িয়ে বাস্তবে ঘটে গেল এক অসম্ভব ঘটনা। উত্তরপাড়ার বাসিন্দা উত্তম নস্কর, যিনি প্রায় ১৯ বছর ধরে কোনও পিটুইটারি গ্রন্থি ছাড়াই জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন—তাঁর বিরল শারীরবৃত্তীয় বাস্তবতা আজ স্তম্ভিত করেছে গোটা চিকিৎসা মহলকে।
পিটুইটারি গ্রন্থিকে বলা হয় ‘মাস্টার গ্ল্যান্ড’—যা শরীরের বিভিন্ন হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে, প্রজননক্ষমতা ও শারীরিক বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই গ্রন্থি ছাড়া সাধারণত শিশুকালেই মৃত্যু অনিবার্য। অথচ, সেই ‘কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক’ ছাড়াই উত্তম দিব্যি বেঁচে থেকেছেন প্রায় দুই দশক!
সূত্রপাত এক বিষাক্ত কামড়ে
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৬ সালে, যখন চন্দ্রবোড়া সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন উত্তম। সেই থেকে শুরু হয় শরীরের একাধিক জটিলতা—কিডনি সমস্যা, স্মৃতিভ্রষ্টতা, দাড়ি না ওঠা, যৌনক্ষমতার লোপ এবং শারীরিক বৃদ্ধি থেমে যাওয়া।
তবে এতসব উপসর্গের পেছনে যে পিটুইটারি গ্রন্থির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি রয়েছে, তা জানা যায় মাত্র কয়েক মাস আগে। একটি এমআরআই স্ক্যানে ধরা পড়ে, তাঁর মস্তিষ্কে এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থির কোন চিহ্ন নেই!
চিকিৎসকের চোখে এই ঘটনা এক বিস্ময়
এই অসামান্য সন্ধান করেন কলকাতার বিশিষ্ট এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডা. সত্যম চক্রবর্তী। তাঁর মতে, চন্দ্রবোড়ার হেমোটক্সিক বিষ রক্তের জমাট বাঁধার ক্ষমতা নষ্ট করে, যার ফলে মস্তিষ্কে ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সম্ভবত সেই কারণেই পিটুইটারি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।
তিনি বলেন,
“আমার চিকিৎসাজীবনে এমন রোগী আগে কখনও দেখিনি। পিটুইটারি ছাড়া এত দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা এক অলৌকিক ঘটনা।”
হরমোন থেরাপিতে ফিরছে জীবন
বর্তমানে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির মাধ্যমে ধীরে ধীরে উত্তমের শরীরে ফের কাজ করছে অনেক কিছু। শরীরিক এবং মানসিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে তিনি। তাঁর নিজের কথায়—
“আমি ভাবতেই পারিনি এত বড় বিপদে ছিলাম। এখন অনেকটাই ভালো আছি। আবার স্বপ্ন দেখতে পারছি।”
এক বিরল ঘটনা, এক নতুন প্রশ্ন…
উত্তম নস্করের জীবন আমাদের সামনে নতুন করে তুলে ধরে মানবদেহের সহনশীলতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং ভাগ্যের অদ্ভুত খেলাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই ঘটনা ভবিষ্যতের গবেষণার এক অমূল্য উপাদান হয়ে থাকবেই।







