পূর্ব ভারতের অপরাধ জগতের এক কিংবদন্তি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে ফেরার থাকা ‘ঘোষদা’ ওরফে পিন্টু ঘোষ ওরফে দীপঙ্কর ঘোষ অবশেষে পুলিশের জালে। বাংলা-বিহার-ঝাড়খণ্ডের রেল সিন্ডিকেটে ‘বেতাজ বাদশা’ হিসেবে পরিচিত এই অপরাধীর গ্রেপ্তারকে বড়সড় সাফল্য বলছে রাজ্য পুলিশ।
শুক্রবার সকাল ১০টা নাগাদ উত্তর ২৪ পরগনার নিমতা বাজার এলাকা থেকে ধৃত হয় পিন্টু। তাকে গ্রেপ্তার করে পুরুলিয়া জেলা পুলিশ, ২০০৩ সালের আদ্রার তৃণমূল শহর সভাপতি ধনঞ্জয় চৌবে খুন মামলায়। তার জবানবন্দিতে পরে ধরা পড়ে পিন্টুর সঙ্গী জুগনু সিং ওরফে ধর্মেন্দ্র সিং — বিহারের মুজফফরপুর জেলার বাসিন্দা। শনিবার রঘুনাথপুর আদালতে তোলা হলে দু’জনকেই ১২ দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হয়।
অন্ধকার থেকে উঠে আসা ‘ডন’
পুরুলিয়ার আদ্রার বেনিয়াশোলের বাসিন্দা পিন্টু ঘোষ একসময় সংবাদপত্র বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় তার দিকচিহ্ন। রেল কন্ট্রাক্টের দুনিয়ায় পা রাখার পরই অপরাধ জগতের সঙ্গে মিশে যায় তার নাম। পরে উত্তর ২৪ পরগনার নিমতা থানার দুর্গানগরের রবীন্দ্রপল্লিতে স্ত্রীর নামে থাকা বাড়িতেই গা ঢাকা দেয় সে। এলাকার মানুষ তাকে চিনত ‘ঘোষদা’ নামে — জমি ব্যবসায়ী হিসেবে। বাড়ির চারপাশ সিসিটিভিতে ঘেরা, যাতে পুলিশের চোখ ফাঁকি দেওয়া যায়।
অপরাধ জগতের ‘বেতাজ বাদশা’
রেলশহর আদ্রার আশিস-আসলাম খুন (২০০৩), তৃণমূল নেতা পিন্টু ভার্মা খুন (২০১৬) — একাধিক হত্যা মামলায় নাম জড়িয়ে ছিল পিন্টুর। পুলিশ সূত্রে খবর, ১০টিরও বেশি খুনের মামলা রয়েছে তার নামে। বাংলা-ঝাড়খণ্ড-বিহারের রেল প্রকল্প, দরপত্র, নিলাম — সবেতেই শেষ কথা ছিল এই পিন্টু ঘোষের। ঝাড়খণ্ডের জিতেন্দ্র প্রসাদ, বিহারের লালন ঠাকুর, অন্নু ঠাকুরের মতো প্রভাবশালী দুষ্কৃতীদের সঙ্গে ওঠাবসা ছিল তার।
একসময় পুলিশের নজর এড়াতে সে নেপালেও পালিয়ে যায়, আর দেশে ফিরে উত্তর ২৪ পরগনাকে নিজের আস্তানা বানায়।
‘দুষ্কৃতী যতই বুদ্ধিমান হোক, ভুল একদিন হবেই’ — পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, “২০০৩ সাল থেকে একের পর এক অপরাধ করে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিল পিন্টু। কিন্তু দুষ্কৃতীরা কোনো না কোনো ভুল করেই ফেলে। সেই ভুলের জন্যই আজ ধরা পড়েছে সে।”
পুলিশ জানায়, পিন্টুর কোনো ছবি, ফোন নম্বর বা ঠিকানা তাদের হাতে ছিল না। শুধুমাত্র নামটিই ভাসত গোপন সূত্রে — “পিন্টু ঘোষ”! এতটাই সাবধানী ছিল যে নিজের কাছে কোনও ইলেকট্রনিক গ্যাজেট রাখত না, যাতে ট্র্যাক করা না যায়। এমনকি তার সম্ভাব্য মুখাবয়ব নিয়ে বিশেষজ্ঞরা একটি স্কেচও তৈরি করেছিলেন, কিন্তু তাতেও মিল পাওয়া যায়নি।
জুগনুর গ্রেপ্তারেও রহস্য উন্মোচন
বিহারের জুগনু সিংয়ের নামে প্রায় ১০টি মামলা ছিল। সে-ও বহু বছর ধরে ফেরার। বিহার পুলিশ তার গ্রেপ্তারের জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। ধনঞ্জয় চৌবে খুনের শুটারদের জোগাড়, বৈঠক এবং অস্ত্র সরবরাহের দায়িত্বে ছিল জুগনু।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রাথমিক চার্জশিটে পিন্টু ও জুগনুর নাম ইতিমধ্যেই রয়েছে। এছাড়াও ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তৃণমূল নেতা হামিদ আনসারি খুনেও তাদের যোগের ইঙ্গিত মিলেছে।
শেষ কথা
দুই দশক ধরে পুলিশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পূর্ব ভারতের রেল সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করা এই অপরাধীর গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে রাজ্য পুলিশের বড় জয়। এখন দেখার বিষয় — এই ‘ঘোষদা’ ধরা পড়ার পর অপরাধ জগতের কোন নতুন তথ্য সামনে আসে।







