রাজনীতিতে ভোটের অঙ্ক কষতে গেলে একটি সমীকরণ বারবার সামনে আসে—মহিলা ভোট। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন থেকে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন, একাধিক ভোটের পরিসংখ্যান ঘেঁটে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত প্রায় এক—বাংলার মহিলা ভোটাররা ধারাবাহিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। সেই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বৃহস্পতিবার পেশ হওয়া রাজ্য সরকারের অন্তর্বর্তী বাজেটকে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের অনেকের মতে, এই বাজেট শুধুই আর্থিক নথি নয়—এটি কার্যত তৃণমূল সরকারের মহিলা ভোটব্যাঙ্ক অটুট রাখার একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক নকশা।
পরিসংখ্যানই সেই ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটার ৭ কোটি ৬৩ লক্ষেরও বেশি। তার মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৮৮ লক্ষ মহিলা। অর্থাৎ রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই মহিলা। ফলে যে কোনও নির্বাচনে তাঁদের ভূমিকা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, অনেক সময় নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। সেই ভোটের মানচিত্রে চোখ রাখলেই স্পষ্ট, রাজ্য সরকারের সামাজিক প্রকল্পগুলির অভিমুখ ক্রমশই মহিলামুখী হয়েছে।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী—এই প্রকল্পগুলি আজ আর কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, বাংলার ঘরে ঘরে পরিচিত নাম। রাজ্য সরকারের দাবি, এই প্রকল্পগুলি বহু মহিলার জীবনযাত্রায় বাস্তব পরিবর্তন এনেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়কদের ভাতা বৃদ্ধি। অন্তর্বর্তী বাজেটের দিকে তাকালেই দেখা যায়, ভোট বছরের ঠিক আগে এই সমস্ত ক্ষেত্রেই বরাদ্দ বেড়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এ কি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, না কি নিখুঁত রাজনৈতিক কৌশল?
মমতার তিন তির
এই বাজেটের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। প্রকল্পে মাসিক ভাতা আরও ৫০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে প্রায় ২ কোটি ৪২ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী। অন্যদিকে, আশা কর্মীদের জন্য মাসিক ভাতা ১,০০০ টাকা বৃদ্ধি, ১৮০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে পরিবারকে এককালীন ৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়কদের ক্ষেত্রেও মাসিক সম্মানিক ১,০০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে এখানেও পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংখ্যার হিসেবে এই গোষ্ঠীর রাজনৈতিক গুরুত্ব কম নয়। রাজ্যে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৪ হাজার ৩২১ জন, সহায়ক ৯৫ হাজার ২৪১ জন এবং আশা কর্মী প্রায় ৭২ হাজার। তাঁদের পরিবার মিলিয়ে একটি বিশাল সামাজিক গোষ্ঠী তৈরি হয়, যাদের ভোটের প্রভাব উপেক্ষা করার জায়গা নেই।
বর্তমানে আশা কর্মীরা মাসে ৯,০০০ টাকা ভাতা পান। ২০২৪ সালে তা বাড়ানো হয়েছিল ৮,২৫০ টাকা থেকে। এবারের বাজেট ঘোষণার পর তা বেড়ে হল ১০,০০০ টাকা। যদিও তাঁদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময়ে দাবি ছিল মাসিক ভাতা ১৫,০০০ টাকা।
অন্যদিকে, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের মাসিক ভাতা ছিল ৯,০০০ টাকা এবং সহায়কদের ৭,২৫০ টাকা। নতুন ঘোষণার পর তা বেড়ে হয়েছে যথাক্রমে ১০,০০০ টাকা এবং ৮,২৫০ টাকা। উল্লেখযোগ্য, এই ভাতার একটি অংশ দেয় রাজ্য সরকার, বাকিটা কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ।
তবে প্রতিক্রিয়া একমুখী নয়। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের একাংশের দাবি ছিল ভাতা ২৬,০০০ এবং সহায়কদের ১৮,০০০ টাকা করা হোক। সেই দাবি পূরণ না হওয়ায় কেউ কেউ এই বৃদ্ধিকে ‘ললিপপ’ বলছেন, আবার কারও মতে ভোটের বছরে অন্তত কিছুটা তো বাড়ল—এতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে বাজেটের ছবিটা অনেকটাই পরিষ্কার। প্রশাসনিক ভাষায় একে বলা যেতে পারে সামাজিক সুরক্ষা জোরদার। রাজনৈতিক ভাষায় অনেকেই বলছেন—ভোটের আগে ঘুঁটি সাজানো। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন এখনও কিছুটা দূরে হলেও, অন্তর্বর্তী বাজেট দেখে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত, সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। আর সেই প্রস্তুতির কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছেন বাংলার মহিলা ভোটাররা।






