বিশ্ব

মার্কিন চাপে ইরানের ‘নিউক্লিয়ার বাঙ্কার’ তৎপরতা! স্যাটেলাইট ছবিতে ফাঁস পার্চিন-নাটানজে গোপন শক্তিশালীকরণ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপের প্রেক্ষিতে ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু স্থাপনাগুলিকে শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে রূপান্তর করার কাজ জোরদার করেছে। নতুন হাই-রেজোলিউশন স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে এমনই দাবি করা হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক নজরদারি সংস্থা Institute for Science and International Security-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে এই তথ্য।

সংস্থার মতে, সংবেদনশীল কেন্দ্রগুলিকে দ্রুত কংক্রিটের আবরণে ঢেকে মাটির নিচে সুরক্ষিত করার কাজ চলছে। কূটনৈতিক আলোচনা চললেও, তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ যে কমেনি, তা স্পষ্ট।

পার্চিনে কংক্রিট ‘সারকোফেগাস’, মাটির নিচে লুকোচ্ছে কেন্দ্র
তেহরানের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত Parchin সামরিক কমপ্লেক্সের ভেতরে ‘তালেঘান ২’ নামে একটি কেন্দ্রকে দ্রুত ভূগর্ভস্থ করা হচ্ছে বলে দাবি রিপোর্টে। ১৩ ফেব্রুয়ারির স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, মূল কাঠামোর চারপাশে কংক্রিটের আবরণ সম্পূর্ণ হয়েছে এবং তার উপর মাটি চাপানোর কাজ শুরু হয়েছে।

আইএসআইএস প্রধান David Albright সতর্ক করে বলেছেন, খুব শিগগিরই কেন্দ্রটি পুরোপুরি সুরক্ষিত বাঙ্কারে পরিণত হতে পারে, যা আকাশপথে হামলা থেকেও যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে সক্ষম হবে।

ছবিতে আরও দেখা যায়, কংক্রিট শক্ত হওয়ার পর দ্রুত মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আশপাশের উঁচু অংশে জমা মাটিও কাঠামো ঢাকার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অনুমান। ফলে বাইরে থেকে সীমিত প্রবেশপথ ছাড়া বিশেষ কিছু দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

এলাকাটি উঁচু নিরাপত্তা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ভেতরে একটি কংক্রিট মিক্সিং প্ল্যান্টও চিহ্নিত হয়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে—নির্মাণকাজ এখনও চলছে।

নাটানজে টানেল শক্তিশালীকরণ, পাহাড়ের নিচে প্রস্তুতি
১০ ফেব্রুয়ারির স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, Natanz Nuclear Facility-র কাছাকাছি কোলাং-গাজ লা পাহাড়ের নিচে টানেলগুলির প্রবেশপথ শক্তিশালী করার কাজ চলছে।

পশ্চিম দিকের দীর্ঘ টানেল মুখে কংক্রিট ঢালা হচ্ছে। পূর্ব দিকের প্রবেশপথে মাটি ও পাথর সরিয়ে সমতল করা হয়েছে, যাতে অতিরিক্ত স্তর (ওভারবার্ডেন) যোগ করে সম্ভাব্য বিমান হামলার অভিঘাত সামাল দেওয়া যায়।

সংস্থার দাবি, এসব পদক্ষেপ টানেলগুলিকে আরও সুরক্ষিত করছে। এছাড়া ছোট আকারের ছাদ-ঢাকা যানবাহনের উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে—ভেতরের কাজও এগোচ্ছে। অতীতে ইরান জানিয়েছিল, এখানে উন্নত সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন কেন্দ্র পুনর্গঠন করা হচ্ছে। তবে বিশাল আকার ও পাহাড়ি আচ্ছাদন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—এখানে কি আরও সংবেদনশীল কার্যক্রম চলছে?

এসফাহানে গোপনীয়তা বাড়ানোর চেষ্টা
Isfahan-এর পরমাণু কমপ্লেক্সেও গোপনীয়তা বাড়ানোর পদক্ষেপ নজরে এসেছে। ৮ ফেব্রুয়ারির ছবিতে টানেলের প্রবেশপথ আড়াল করার চেষ্টা ধরা পড়েছে। তবে এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে সংস্থা।

আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার
গত বছরের সংঘাতের পর পার্চিনে সক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পুরনো অ্যান্টি-এয়ারক্রাফ্ট সাইট পুনরায় চালু করা হয় এবং জুলাই-অগস্টে আরও দুটি নতুন প্রতিরক্ষা অবস্থান যোগ করা হয়েছে। মূলত বিমানবিধ্বংসী আর্টিলারি মোতায়েন করে ওই অঞ্চলের প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, পার্চিন অতীতে ইরানের ‘আমাদ প্ল্যান’-এর অংশ হিসেবে পরমাণু অস্ত্র-সংক্রান্ত গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি। সেখানে নিউট্রন ইনিশিয়েটর ও মাল্টিপয়েন্ট ইনিশিয়েশন সংক্রান্ত পরীক্ষা অন্তত ২০০৪ সাল পর্যন্ত চলেছিল বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।

কূটনীতি বনাম প্রস্তুতি
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা এখনও চলছে। মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের পক্ষ থেকে নতুন প্রস্তাব আসতে পারে।

তবে সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ইরান তার পরমাণু অবকাঠামোও সমানতালে শক্তিশালী করছে। নির্মাণকাজের গতি ও প্রকৃতি ইঙ্গিত দিচ্ছে এর কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি, যদিও প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনও নিশ্চিত নয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির টানাপোড়েনের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে—এটি কি শুধুই প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ, নাকি ভবিষ্যতের বড় কৌশলগত পরিকল্পনার ইঙ্গিত?

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Adblock Detected

Please Turn Off Your Ad Blocker.