বিশ্ব

তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলা হলে ‘আগুনে জ্বলবে গোটা আরব দুনিয়া’, আমেরিকা–ইজরায়েলকে কড়া হুঁশিয়ারি ইরানের

আরব দুনিয়ায় ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠা যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই আরও বড় সংঘাতের আশঙ্কা উসকে দিল ইরান। দেশের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর ওপর কোনও হামলা হলে শুধু ইরানেই নয়, গোটা অঞ্চলের জ্বালানি পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে ভয়াবহ পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। কার্যত আমেরিকা ও ইজরায়েলকে লক্ষ্য করেই এই সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরানের আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় অপারেশনাল কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়াটার্স জানায়, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে যদি ইরানের তেল-গ্যাস স্থাপনা, বন্দর বা জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর সামান্যতম আক্রমণও হয়, তবে তার জবাব হবে ‘চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়ার মতো বিধ্বংসী’।

এক মুখপাত্র বলেন, “আমরা আগ্রাসী সরকার ও তাদের সব মিত্রদের সতর্ক করছি—ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরানের জ্বালানি পরিকাঠামো বা বন্দরগুলির ওপর সামান্যতম আক্রমণও হলে তার পাল্টা জবাব হবে ভয়াবহ।”

পাল্টা হামলা ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো অঞ্চলে
ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সম্ভাব্য প্রতিশোধ শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যদি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা হয়, তাহলে সেই সমস্ত তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলিকেই লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে যেখানে আমেরিকা ও পশ্চিমি দেশগুলির স্বার্থ জড়িত। ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাই বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই তীব্র
ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই এই হুঁশিয়ারি সামনে এল। মার্কিন সামরিক সূত্রের দাবি, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের ভেতরে পাঁচ হাজার পাঁচশোরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ৬০টিরও বেশি জাহাজে আঘাত হানার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

‘আধঘণ্টায় অন্ধকারে ডুবে যাবে গোটা অঞ্চল’
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন।

সামাজিক মাধ্যম X-এ তিনি লেখেন, “যদি ইরানের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ওপর হামলা হয়, তাহলে আধঘণ্টারও কম সময়ে গোটা অঞ্চল অন্ধকারে ডুবে যাবে। আর সেই অন্ধকারই পালাতে থাকা মার্কিন সেনাদের শিকার করার সুযোগ তৈরি করবে।”

তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু কয়েকটি টুইট করে যুদ্ধ জেতা যায় না। এই গুরুতর ভুলের জন্য আমরা আপনাদের অনুতপ্ত না করা পর্যন্ত থামব না।”

ট্রাম্পের পাল্টা দাবি
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক শক্তি ইতিমধ্যেই বড় অংশে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। মেরিল্যান্ডে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “তাদের আর কার্যত কোনও নৌবাহিনী নেই, বিমানবাহিনী নেই, আকাশ প্রতিরক্ষাও নেই। আমরা প্রায় অবাধেই সেই দেশের ওপর দিয়ে চলাফেরা করছি।”

হরমুজ প্রণালী বন্ধের ইঙ্গিত
পরিস্থিতি আরও জটিল করে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই দেশের মানুষের কাছে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার মতো কৌশলও ব্যবহার করা হতে পারে, যাতে প্রতিপক্ষ দেশগুলির ওপর চাপ বাড়ানো যায়।

ভবিষ্যতে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না: তেহরান
ইরানের উপ-বিদেশমন্ত্রী মাজিদ তখত রাভানচি জানিয়েছেন, তেহরানের মূল লক্ষ্য ভবিষ্যতে যেন কোনও দেশ আর ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে না পারে। AFP-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক আগ্রাসনে যুক্ত হয়, তাহলে অঞ্চলে থাকা সমস্ত মার্কিন ঘাঁটি ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজরায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূচনা হয়। ওই হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। তারপর থেকেই দ্রুত বিস্তৃত হয়ে এই সংঘাত এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বড় আকারের অস্থিরতায় রূপ নিয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Adblock Detected

Please Turn Off Your Ad Blocker.