দেশ

সোমনাথ মন্দিরের অজানা কাহিনী , প্রধানমন্ত্রীর কলমে … কি লিখলেন তিনি ?

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী , তাঁর আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যে একটা গভীর যোগ রয়েছে , তা আমাদের সকলেরই জানা । দেশের নানা জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে সতীপীঠ , এমনকি গভীর জলের নিচের দ্বারকা নগরী , সবই দর্শন করেছেন তিনি । তবে সোমনাথ মন্দির , তাঁর হৃদয়ের খুব কাছেরও । শ্রী সোমনাথ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হিসেবেও রয়েছেন নরেন্দ্র মোদী । সূত্রের খবর , ১১ মে সোমনাথ দর্শনে যাবেন মোদী । তবে তার আগে সোমনাথ মন্দিরের গুরুত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী , নিজেই কলম ধরলেন ।

কি লিখলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী ? নরেন্দ্র মোদী লেখেন , “২০২৬ সালের শুরুতে আমি গিয়েছিলাম সোমনাথে, ‘সোমনাথ স্বাভিমান পর্বে যোগ দিতে। সেই অনুষ্ঠান ছিল সোমনাথ মন্দিরের উপরে প্রথম আক্রমণের এক হাজার বছর পূর্তি। এবার আগামী ১১ মে আমি আবারও সোমনাথ মন্দিরে যাব, পুনর্নির্মিত সোমনাথ মন্দিরের উদ্বোধনের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে। মাত্র ছ’মাসেরও কম সময়ে সোমনাথের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকের সাক্ষী হওয়া আমার কাছে এক বিশেষ সৌভাগ্যের বিষয়। ধ্বংস থেকে সৃষ্টির পথে সোমনাথের যাত্রা—যাকে আমরা বলি ‘ধ্বংস থেকে সৃজন’—তারই এক জীবন্ত প্রতীক এই অনুষ্ঠানগুলি।”

তিনি আরও লেখেন , “সোমনাথ আমাদের সভ্যতার এক চিরন্তন বার্তা দেয়। তার সামনে বিস্তীর্ণ সমুদ্র যেন সময়ের অনন্ত প্রবাহের কথা মনে করিয়ে দেয়। সমুদ্রের ঢেউ যেন বলে- ঝড় যতই ভয়ঙ্কর হোক, সময় যতই কঠিন হোক, আত্মসম্মান ও শক্তি নিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো সম্ভব। প্রতিটি ঢেউ তীরে ফিরে এসে যেন আগামী প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়—এই জাতির আত্মাকে কখনও দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা যায় না।”

“আমাদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে—‘প্রভাসং চ পরিক্রম্য পৃথিবীক্রম সম্ভবম।’ অর্থাৎ, দেবভূমি প্রভাস তথা সোমনাথকে প্রদক্ষিণ করা মানে যেন সমগ্র পৃথিবী প্রদক্ষিণের সমতুল্য পুণ্যলাভ। যুগের পর যুগ ধরে মানুষ এখানে শুধু উপাসনার জন্যই আসেননি, তাঁরা অনুভব করেছেন এমন এক অবিচ্ছিন্ন সভ্যতার ধারা, যার আলোকশিখা কখনও নিভে যায়নি। বহু সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন হয়েছে, সময় বদলেছে, বিদেশি আক্রমণ ও অস্থিরতার ঝড় বয়ে গেছে, তবুও ভারতীয় চেতনায় সোমনাথ অমর ও অটুট থেকেছে।”

“আজ সেই সব মহাপুরুষদের স্মরণ করার সময়, যাঁরা অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে অবিচলভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। সোমা শর্মন প্রভাসকে এক মহান তীর্থ ও দর্শনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। ভালভীর সম্রাট ধারাসেন চতুর্থ সেখানে দ্বিতীয় মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ভীমদেব, জয়পাল এবং আনন্দপাল বিদেশি আক্রমণের বিরুদ্ধে সভ্যতার সম্মান রক্ষার সংগ্রামের জন্য আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।”

“লোককথায় বলা হয়, রাজা ভোজও মন্দির পুনর্নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করেছিলেন। কর্ণদেব ও সিদ্ধরাজ জয়সিংহ গুজরাটের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বড় ভূমিকা পালন করেন। ভাব বৃহস্পতি, কুমারপাল সোলাঙ্কি এবং পাশুপত আচার্যরা সোমনাথকে পুনর্গঠন করে একে উপাসনা ও বিদ্যাচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। বিশালদেব ভাগেলা ও ত্রিপুরান্তক এর আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।”

“মহীপালদেব এবং রা খাঙ্গার ধ্বংসস্তূপের পর আবারও সেখানে পূজার্চনা চালু করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। অহল্যাবাই হোলকর, যাঁর ৩০০তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ভক্তির ধারাকে অব্যাহত রেখেছিলেন। বরোদার গায়কোয়াড় রাজপরিবার তীর্থযাত্রীদের অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এই মাটিই জন্ম দিয়েছিল বীর হামিরজি গোহিল ও বীর ভেগদাজি ভিলের মতো সাহসী যোদ্ধাদের, যাঁদের আত্মত্যাগ ও বীরত্ব আজও সোমনাথের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।”

“১৯৪০-এর দশকে, যখন স্বাধীনতার আন্দোলনে গোটা ভারত উত্তাল এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে নতুন ভারতের ভিত রচিত হচ্ছিল, তখনও সোমনাথের দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। ১৯৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর দীপাবলির সময় তিনি ভগ্নপ্রায় সোমনাথ মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের জল হাতে নিয়ে ঘোষণা করেছিলেন—‘গুজরাটি নববর্ষের এই পবিত্র দিনে আমরা সংকল্প নিয়েছি, সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণ করা হবে। সৌরাষ্ট্রের মানুষকে এই মহৎ কাজে সর্বশক্তি দিয়ে অংশগ্রহণ করতে হবে।’ তাঁর সেই আহ্বানে শুধু গুজরাট নয়, সমগ্র ভারত সাড়া দিয়েছিল।”

“দুঃখের বিষয়, সর্দার প্যাটেল তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দেখে যেতে পারেননি। পুনর্নির্মিত সোমনাথ মন্দির ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়ার আগেই তিনি প্রয়াত হন। তবে তাঁর সেই স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যান কে এম মুন্সি ও নওয়ানগরের জামসাহেব। ১৯৫১ সালে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে উদ্বোধনের জন্য রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ড. প্রসাদ অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং সেই মুহূর্ত ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।”

“আমার মনে পড়ে ২০০১ সালের অক্টোবর মাসের কথা, যখন আমি সদ্য গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছি। ৩১ অক্টোবর, সর্দার প্যাটেলের জন্মজয়ন্তীতে, সোমনাথ মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গুজরাট সরকার একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সেই অনুষ্ঠান ছিল সর্দার প্যাটেলের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনেরও অংশ। সেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আডবাণী উপস্থিত ছিলেন।”

“১৯৫১ সালের ১১ মে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, সোমনাথ মন্দির বিশ্বের সামনে এই সত্য তুলে ধরে যে গভীর বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে কখনও ধ্বংস করা যায় না। তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন, এই মন্দির মানুষের হৃদয়ে চিরকাল জীবন্ত থাকবে। তিনি আরও বলেছিলেন, সোমনাথের পুনর্নির্মাণ সর্দার প্যাটেলের স্বপ্ন পূরণ করলেও প্রকৃত দায়িত্ব হল মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা। তাঁর এই বক্তব্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণামূলক।”

“গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা সেই ভাবনাকেই সামনে রেখে এগিয়ে চলেছি। ‘বিকাশ ভি, বিরাসত ভি’—এই নীতিকে ধারণ করে সোমনাথ থেকে কাশী, কামাখ্যা থেকে কেদারনাথ, অযোধ্যা থেকে উজ্জয়িনী, ত্র্যম্বকেশ্বর থেকে শ্রীশৈলম—দেশের বিভিন্ন আধ্যাত্মিক কেন্দ্রকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে উন্নত করার পাশাপাশি তাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের কাজও করা হয়েছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও বেশি মানুষকে এই তীর্থস্থানে পৌঁছতে সাহায্য করছে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি মজবুত হচ্ছে, কর্মসংস্থান বাড়ছে এবং ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’-এর ভাবনাও আরও শক্তিশালী হচ্ছে।”

“সোমনাথকে রক্ষা ও পুনর্গঠনের জন্য যাঁরা আত্মবলিদান দিয়েছেন, তাঁদের ত্যাগ ও সংগ্রাম কখনও বিস্মৃত হবে না। ভারতের নানা প্রান্তের অসংখ্য মানুষ সোমনাথের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে অবদান রেখেছেন। তাঁদের কাছে ভারতের প্রতিটি অঞ্চলই ছিল সমান পবিত্র এবং এক অবিচ্ছেদ্য চেতনায় আবদ্ধ। বিভাজনমুখী আজকের পৃথিবীতে এই ঐক্যের বার্তা আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।”

“সোমনাথ চিরকাল গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে, কারণ ঐক্য ও সভ্যতার সেই চেতনা আজও প্রতিটি ভারতীয়ের হৃদয়ে জীবন্ত। এই গৌরবময় স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং হাজার বছরের বীরত্বগাথাকে স্মরণ করে আগামী এক হাজার দিন ধরে সোমনাথে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হবে। বহু মানুষ ইতিমধ্যেই এই উদ্যোগে দান করছেন, যা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।”

“আমি দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানাই—এই বিশেষ সময়ে অন্তত একবার সোমনাথ দর্শনে আসুন। সোমনাথের সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে তার সুদীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিধ্বনি অনুভব করুন। সেখানে আপনি শুধু ভক্তির আবেগেই নয়, এমন এক সভ্যতার স্পন্দনে আপ্লুত হবেন, যা কখনও পরাজয় স্বীকার করেনি, কখনও ভেঙে পড়েনি। আপনি উপলব্ধি করবেন ভারতের অদম্য আত্মশক্তিকে এবং বুঝতে পারবেন কেন শত আঘাতের পরও আমাদের সংস্কৃতি আজও অম্লান ও অপরাজিত। সেই অনন্ত বিজয়ের অনুভূতি সত্যিই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Adblock Detected

Please Turn Off Your Ad Blocker.