দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ‘ফ্লাইদুবাই ১০৭৩’ বিমানে গত ৩০ সেপ্টেম্বর মাঝআকাশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘটনার তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তের স্বার্থে এতদিন ওমানি কো-পাইলটকে নিয়ে গোপনীয়তা বজায় রেখেছিল প্রশাসন। তবে ধীরে ধীরে ঘটনার বিভিন্ন দিক প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্ত কো-পাইলটকে আগেই নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল ওমান এয়ার। সূত্রের খবর, ২০২৪ সালে প্রশিক্ষণ চলাকালীন তাঁর মধ্যে উগ্রপন্থী মতাদর্শের উপস্থিতি ধরা পড়ে। এরপর তাঁকে উড়ানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে প্রশাসনিক কাজে নিয়োগ করা হয়েছিল বলেও জানা গিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এমন অতীত থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি দুবাইয়ের একটি বিমান সংস্থায় চাকরি পেলেন এবং তেল আভিভের মতো স্পর্শকাতর রুটে দায়িত্ব পেলেন।
এবিসি নিউজের একটি সূত্রের দাবি, তদন্তের প্রয়োজনে ওই ওমানি পাইলটকে সৌদি আরব থেকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি তদন্তকারীদের সহযোগিতা করছেন বলেও জানা গিয়েছে।
সৌদি সংবাদমাধ্যম ‘আল আরাবিয়া’-র সূত্র অনুযায়ী, অভিযুক্ত কো-পাইলটের নাম হামাম আল-হামামি। তিনি ওমানের নাগরিক। উগ্রপন্থী ও মৌলবাদী ভাবধারার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সন্দেহে ওমান সরকার আগেই তাঁকে বিমান চালানোর কাজ থেকে নিষিদ্ধ করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এবিসি নিউজের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণ দেখিয়ে ওমান এয়ার তাঁকে চাকরি থেকে সরিয়ে দিয়েছিল।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম i24NEWS-এর দাবি, ঘটনার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আল-হামামি নাকি স্বীকার করেছেন যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে বিমানটিকে ইজরায়েলের মাটিতে আছড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। ফলে এখন তদন্তকারীদের অন্যতম প্রশ্ন, তাঁর এই অতীত সম্পর্কে ওমান সরকার কিংবা ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষ কতটা অবগত ছিল। পাশাপাশি ওমানের তরফে কোনও নিরাপত্তা সতর্কতা অন্য দেশ বা বিমান সংস্থার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ১৭০ জনেরও বেশি যাত্রী ও ক্রু সদস্যকে নিয়ে দুবাই থেকে তেল আভিভের উদ্দেশে উড়েছিল ফ্লাইদুবাইয়ের ১০৭৩ নম্বর বিমান। উড়ানের কিছুক্ষণ পর সৌদি আরবের আকাশসীমায় প্রবেশের সময় ককপিটে ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করেন কো-পাইলট আল-হামামি।
রয়টার্সের ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামলার পর বিমানটিতে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়। এক মিনিটেরও কম সময়ে বিমানটি প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতা হারিয়ে ফেলে। দ্রুত উচ্চতা কমে যাওয়ায় বিমানের যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
গুরুতর আহত অবস্থাতেও ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছার অসাধারণ উপস্থিতবুদ্ধির পরিচয় দেন। কোনওভাবে তিনি ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে যাত্রী এবং কেবিন ক্রু সদস্যরা দ্রুত ককপিটে ঢুকে অভিযুক্ত কো-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। রয়টার্সের যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁকে কেবিনে থাকা একটি তার দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। একই বিমানে থাকা এক চিকিৎসক আহত ক্যাপ্টেনের চিকিৎসা শুরু করেন।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওই বিমানের যাত্রী হিসেবেই ফ্লাইদুবাইয়ের দুই অফ-ডিউটি পাইলট সফর করছিলেন। জরুরি পরিস্থিতিতে তাঁরা দ্রুত ককপিটের দায়িত্ব নেন। বিমান থেকে ‘ইনলফুল ইন্টারফেয়ারেন্স’ সংক্রান্ত জরুরি সংকেত পাঠানো হয়। পরে বিমানটির গতিপথ পরিবর্তন করে উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। এর ফলে বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয় এবং বিমানে থাকা ১৭০ জনেরও বেশি যাত্রী নিরাপদে রক্ষা পান।
ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, অভিযুক্ত কো-পাইলট উগ্র ইসলামি মৌলবাদের প্রভাবে এই হামলা চালিয়েছিলেন এবং আত্মঘাতী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য, এর নেপথ্যে কোনও সংগঠিত গোষ্ঠী রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেউ তাঁকে এই হামলার জন্য পাঠিয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দেন নেতানিয়াহু।
তবে ইজরায়েলের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, হামলাটি ওই ব্যক্তি একাই চালিয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে নিযুক্ত ইজরায়েলি রাষ্ট্রদূতও জানিয়েছেন, ঘটনার পিছনে কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা পরিকল্পনাকারীর সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। এদিকে, ওমান সরকার কিংবা অভিযুক্তের পরিবারের তরফে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
ঘটনাটি সৌদি আরবের আকাশসীমায় ঘটায় প্রথমে সেখানকার পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পরে বিমানটির রেজিস্ট্রেশন যে দেশের, সেই সংযুক্ত আরব আমিরশাহির নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে। ফ্লাইদুবাইও জানিয়েছে, তারা নিজেদের স্তরে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইজরায়েলগামী আন্তর্জাতিক বিমানগুলির নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনও ফাঁক রয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হবে। গোটা ঘটনার পর আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবায় পাইলট নিয়োগ, নিরাপত্তা যাচাই এবং সিকিউরিটি প্রোটোকল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।







