রাজ্য

‘স্বর্গের নিচে মহাবিশৃঙ্খলা’

এক দশকেরও অধিক সময় ধরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে শত হস্ত দূরে কাটিয়েছিলেন তিনি। গত হওয়া কিছু বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, দেশ এবং বাংলা উভয়েই বামফ্রন্ট অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে ক্ষমতার অলিন্দে। তবে ‘বুদ্ধবাবু’ ছিলেন নিজের জায়গাতেই – অটুট! সাদা পাঞ্জাবিতে কালো আঁচর ছাড়াই কালক্রমের ‘চক্র’ হয়েই রয়ে গেলেন শেষ পর্যন্ত।

‘The world is changing, so our policies need to change with the world’, ২০০০ সালে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরবর্তীতে বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাত্‍কারে বলেছিলেন বুদ্ধবাবু। যা তীক্ষ্ণত্ব প্রকাশ্যে আনে। তখন বাংলা দু’দশকের বেশি সময়ব্যপী বামফ্রন্টের জমানা দেখে নিয়েছে। ‘জ্যোতিকালের স্বেচ্ছাবসর’ হওয়ার পরবর্তীতেই বুদ্ধদেব বুঝিয়েছিলেন, আলিমুদ্দিনের নীতিগত বেশকিছু পরিবর্তন দরকার। পরিবর্তন দরকার রাজ্যেও।

প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পাশ করে সরাসরি জড়িয়ে পড়া তৎকালীন সিপিআই-এর সঙ্গে খাদ্য আন্দোলনের দিক ধরে সক্রিয় রাজনীতিতে পদার্পণ। ১৯৬৬ সালে সিপিএম দলে যোগদান বলাবাহুল্য তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৬৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের দ্য ডেমোক্রেটিক ইউথ ফেডারেশনের সেক্রেটারি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া।

এরপর একে একে রাজনীতির ঢাল বেয়ে এগোনো। একাত্তর সালে সিপিএম পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সদস্য হওয়া, তারপর ১৯৭৭ সালের বামফ্রন্টের ঐতিহাসিক জয়ের নির্বাচনে উত্তর কলকাতা থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হওয়া – রাজনৈতিক উত্তরণ ছিল সাফল্যের বাঁধানো। টানা এগারো বছর মুখ্যমন্ত্রীর আসনে।

তারপর? তারপর সাল ২০১১, তারিখ ১১, মাস মে। কালো মোটা কাঁচের চশমার ওপারের চোখদুটোর স্তব্ধতা বিশালাকার কিছু বলতে চেয়েছিল, আরও কিছু বলতে চেয়েছিল। বলা হয়নি। মহাকরণ থেকে বেরিয়ে একবার থমকে গিয়েছিলেন। ‘প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী’, এই বিশেষণ ততক্ষণে নামের পূর্বে বসে গিয়েছে। গাড়িতে ওঠার মুহুর্তে সংবাদমাধ্যম ঘিরে ধরলে উত্তর এসেছিল একটাই, ‘‌বাংলার মানুষকে একদিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে তাঁরা শিল্প চান না কৃষি চান। আর সেদিন যদি উত্তর শিল্প হয় তাহলে আজকের ভোটের ফলাফল তাঁদের জন্য খুব সুখের হবে না।’‌

শেষ সাক্ষাৎকারে রেখেছিলেন কিছু প্রশ্ন। উত্তর খুঁজতেও চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, কতগুলো শিল্পসংস্থান হয়েছে? প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বেরোচ্ছে। তারপর আর তাঁদের কোনও চাকরি জুটছে না এখানে। সেই তো ছুটছে বেঙ্গালুরু, গুরগাঁও, হায়দরাবাদে। আজ থেকে পাঁচ বছর পর পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কোথায় যাবে?

‘যুগবসান’, ‘নক্ষত্রপতন’, যা’ই বলা হোক। তবে আজ ‘অভিমান’এর দিন। যে অভিমান শেষ অবধি থেকে গেল। ৮০ বছরে প্রয়াত হলেন বাম জমানার শেষ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এদিন সকাল ৮টা বেজে ২০ মিনিটে পাম অ্যাভিনিউতে নিজের বাড়িতেই প্রয়াত হন তিনি। শোনা যায়, প্রাতঃরাশ করেন। আচমকাই শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। কোনওরকম চিকিৎসার সুযোগ না দিয়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একজন প্রকৃত ভারতীয় কমিউনিস্ট যাঁর বিশ্বাস সেই জায়গাতে পৌঁছেছিল, যে জায়গাতে গেলে মানুষের মনে হয়, সমাজতন্ত্র যে মাটিতে পা ফেলেছে, সর্বসময় সেই দেশের মতো করেই সমাজতন্ত্র আসবে এমনটা নয়। এদেশে সমাজতন্ত্র আসলে আসবে ‘এই’ দেশের মতো করে! ‘‌স্বর্গের নীচে মহাবিশৃঙ্খলা’‌ থেকে তাই উদ্ধৃতাংশটি, ‘‌যে বিষয়টি বাস্তবে প্রমাণিত সেটিই সত্য, শুধুমাত্র তত্ত্বে নয় – এই মার্কসীয় ধারণাকেই আমি আঁকড়ে ধরে থাকার চেষ্টা করেছি।’‌

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Adblock Detected

Please Turn Off Your Ad Blocker.