এক সময়কার হলিউডের পোস্টার বয় হিসেবে পরিচিত ছিল নায়ক। সুঠাম চেহারা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, আর ক্ষুরধার বুদ্ধি—সব মিলিয়ে রীতিমতো ‘অ্যাকশন হিরো’র তকমা পেয়েছিলেন ব্রুস উইলিস। ‘ডাই হার্ড’, ‘আর্মাগেডন’, ‘দ্য সিক্সথ সেন্স’—হিট ছবির তালিকায় তাঁর নাম শীর্ষে। তবে এবার, সেই ব্রুস উইলিস আর আগের মতো নেই। হাঁটতে পারেন না, কথাও বলতে ভুলে যান। এমনকি কাছের মানুষদেরও আর ঠিকমতো চিনতে পারেন না তিনি।
প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল, অ্যাফাসিয়া নামে এক মস্তিষ্কজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। তবে পরে চিকিৎসার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পরে, ৭০ পেরনো এই তারকা ভুগছেন এক অত্যন্ত জটিল ও বিরল স্নায়ুবিক রোগে। যার নাম ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় নিউরোডিজেনারেটিভ ডিজঅর্ডার। মূলত মস্তিষ্কের সামনের ও পার্শ্ববর্তী অংশে থাকা স্নায়ুগুলি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। এই অংশগুলিই নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের আচরণ, ভাষা, স্মৃতি, ও বুদ্ধিচর্চা। যার ফলে রোগীর চিন্তাভাবনা, কথাবার্তা ও ব্যবহারে বড়সড় পরিবর্তন দেখা দেয়।
এই রোগের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হল স্মৃতিনাশ নয়, প্রথমে আচরণগত বদল দিয়েই শুরু হয় লক্ষণ। একদা শান্ত মানুষ হঠাৎ করেই হয়ে উঠতে পারেন রুক্ষ ও আক্রমণাত্মক। প্রিয়জনদের উপর সন্দেহ, অস্বাভাবিক রাগ, এমনকি প্রকাশ্যে অশালীন আচরণও হতে পারে। কথা গুছিয়ে বলতে পারেন না, অপরিচিত লোক দেখলেই আচরণ হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক। অনেক সময় খাবার খেতে, হাঁটতে, লিখতে বা কিছু পড়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা যায়।
এখনও স্পষ্ট নয় ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়ার মূল কারণ। ধূমপান, মদ্যপান বা জীবনযাপনের ধরন—এর কোনও কিছুর সঙ্গেই সরাসরি যোগ নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মস্তিষ্কে যদি ‘TDP-43’ নামে একধরনের প্রোটিন জমা হতে থাকে, তা মস্তিষ্কের কোষগুলিকে ধ্বংস করতে শুরু করে। এর জেরে স্নায়ুপ্রক্রিয়া ভেঙে পরে এবং ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যায় মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি। তবে এখনো পর্যন্ত এই রোগের নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা নেই। চলছে গবেষণা, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও স্থায়ী সমাধান খুঁজে পায়নি বিজ্ঞানীরা। যার ফলে, ধরা পরার পর রোগীকে সামলানোই একমাত্র পথ।
ব্রুস উইলিসের মতো তারকার এই মস্তিষ্কজনিত অসুস্থতা ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল, সচেতনতা কতটা জরুরি। বহু ক্ষেত্রেই প্রাথমিক আচরণগত বদলকে মানসিক সমস্যা ধরে নেওয়া হয়। অথচ হতে পারে, তা গুরুতর কোনও স্নায়ুবিক রোগের পূর্বাভাস। এই রোগে আক্রান্ত রোগীরা ভুলে যান কেবল নিজেদের নয়, হারিয়ে ফেলেন নিজস্বতাও। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি দরকার পরিবার ও সমাজের পক্ষ থেকে ধৈর্য ও সহমর্মিতা। সময় থাকতে চিনে নিতে হবে উপসর্গ, যেন আরও অনেক ‘ব্রুস উইলিস’ হারিয়ে না যান অন্ধকারে।







