সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে। গত দু’দিন ধরে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিরুদ্ধে তরুণ নেতা প্রতীক উর রহমানের আক্রমণের ঝাঁজ বাড়তেই প্রশ্ন উঠেছিল—দলের সর্বোচ্চ ফোরামে কি এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে? শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠকে সেই উত্তর জানতে কার্যত উদ্গ্রীব ছিলেন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।
প্রেস মিটের প্রথমার্ধে সংগঠনগত ও রাজনৈতিক রূপরেখা ব্যাখ্যা করেন সেলিম। দ্বিতীয়ার্ধে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে প্রতীক উর প্রসঙ্গ। তবে লক্ষণীয়, একবারও নাম উচ্চারণ না করেই উপমা, নাট্যরূপক, নীতিকথা ও রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত টেনে নিজের বক্তব্য পেশ করেন বর্ষীয়ান এই বাম নেতা। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা—নাম না করেও অনেকটাই বলে দিলেন তিনি।
‘অরগানিক লিডারশিপ’ ও ইঙ্গিত
সেলিমের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ‘অরগানিক লিডারশিপ’। তাঁর দাবি, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সিপিএমের মতো ধারাবাহিকতা অন্য কোনও দলে নেই। “আমরা আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে নেতা তৈরি করি, ভাড়া করে আনি না”—এমন মন্তব্যে পরোক্ষে বিজেপি ও তৃণমূলকে কটাক্ষ করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্যে প্রতীক উরের প্রসঙ্গ অস্বীকার না করেও একপ্রকার স্বীকৃতি মিলেছে—দলেরই তৈরি এক তরুণ নেতৃত্ব আজ বিতর্কের কেন্দ্রে।
‘টার্গেটেড’ তরুণ নেতৃত্ব?
সেলিম বলেন, সিপিএমের তরুণ নেতাদের ‘টার্গেটেড’ করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, “কেউ মমতার মধ্যে লেনিন খুঁজে পেয়েছিল, কেউ মমতার টাকায় লেনিনের ছবি লাগিয়েছিল”—এই মন্তব্যে স্পষ্টতই তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন তিনি। যদিও প্রতীক উরের নাম উচ্চারণ করেননি, রাজনৈতিক মহলে জল্পনা—এ বক্তব্য কি তাঁর দিকেই ইঙ্গিত?
দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক প্রয়াত জেলা নেতার উদাহরণ টেনে সেলিম বলেন, সবচেয়ে কম বয়সে জেলা সেক্রেটারি হওয়ার নজির রয়েছে সিপিএমে। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ নেতৃত্বের গুরুত্ব বোঝাতেই এই প্রসঙ্গ।
‘নৈতিক জয়’ না ‘বিকল্প বাম’?
সেলিমের যুক্তি, তৃণমূলের নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়ের প্রেক্ষিতে সিপিএমের তরুণ মুখদের প্রয়োজন পড়ছে তাদের। “চরিত্রের সন্ধানে” নাটকের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অন্য দল নৈতিকতার ঘাটতি পূরণে সিপিএমের কর্মীদের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। তাঁর দাবি, এটা সিপিএম ও তার নতুন প্রজন্মের নৈতিক জয়।
একইসঙ্গে ‘কয়েকটা ইন্টারভিউ’, ‘পেশাদার সংস্থার স্ক্রিপ্ট’ প্রসঙ্গ তুলে সেলিম ইঙ্গিত দেন—দলত্যাগ বা বিতর্ক পরিকল্পিত প্রচারের অংশ হতে পারে। যদিও সরাসরি কাউকে অভিযুক্ত করেননি।
‘সন্তান হারানোর অনুভূতি’
শেষ পর্যন্ত সরাসরি প্রশ্নের মুখে সেলিম স্বীকার করেন, বিষয়টি বেদনাদায়ক। “নতুন প্রজন্মের একজনকে হারানো সন্তান হারানোর সমতুল্য”—এই মন্তব্যে আবেগপ্রবণ সুর শোনা যায় তাঁর কথায়। তিনি জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর দলীয় নিয়ম মেনে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নেতার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ‘অন্য কনট্যাক্ট’ তৈরির খবর মেলে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ‘অন্য কনট্যাক্ট’ শব্দবন্ধে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে দলবদলের সম্ভাবনার দিকে। যদিও এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা সিপিএম মহলে প্রায় নিশ্চিত ধারণা—প্রতীক উর রহমান শীঘ্রই তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন।
বার্তা কাদের উদ্দেশে?
সেলিম কলার খোসায় পিছলে পড়ার উপমা টেনে বলেন, কাউকে বাঁচাতে গিয়ে যেন নিজে অতল গহ্বরে না তলিয়ে যেতে হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সতর্কবার্তা শুধু এক ব্যক্তিকে নয়, দলের বাকি তরুণ নেতৃত্বকেও উদ্দেশ করে।
নাম না করেও স্পষ্ট বার্তা—দল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে। তবে একইসঙ্গে আবেগঘন স্বীকারোক্তি—দলের তৈরি নেতৃত্ব হারানো সহজ নয়। প্রতীক উর বিতর্ক তাই শুধু দলবদলের জল্পনা নয়, বাম রাজনীতির ভিতরকার প্রজন্ম-রাজনীতিরও প্রতিফলন।







