কখনও কখনও জীবন এমন এক অদ্ভুত বৃত্ত আঁকে, যেখানে কল্পনা আর বাস্তব একে অপরের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়-এর আকস্মিক মৃত্যু সেই বিরল, শিউরে ওঠা সমাপতনের এক নির্মম উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
মাত্র ৪২ বছর বয়সে জলে ডুবে মৃত্যু। আর তার বহু আগেই, ২০১৮ সালে প্রকাশিত নিজের লেখা গল্প ‘বান্ধবীরা’-তে তিনি যেন এঁকে গিয়েছিলেন সেই পরিণতিরই প্রতিচ্ছবি—“৪২ তো যাবার বয়সও না… বেরিয়ে এলাম জল থেকে… শরীর তুলেছে অন্যরা।” আজ সেই লাইনই ফিরে ফিরে আসছে বাস্তবের নিষ্ঠুর প্রতিধ্বনি হয়ে।
রবিবার বিকেলে ওড়িশার তালসারি সমুদ্রতটে একটি ধারাবাহিকের শ্যুটিং চলাকালীন এই দুর্ঘটনা ঘটে। শ্যুটিংয়ের শেষ মুহূর্তে জলে নামেন রাহুল। কিন্তু এখানেই শুরু হয় প্রথম ধোঁয়াশা।
পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল-এর দাবি, তখনও শ্যুটিং চলছিল এবং জলের মধ্যেই একটি দৃশ্য ধারণ করা হচ্ছিল। অন্যদিকে প্রোডাকশন টিমের একাংশের বক্তব্য—শ্যুটিং শেষ হওয়ার পর ব্যক্তিগতভাবে জলে নামেন তিনি।
এই দ্বন্দ্বই ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে—তিনি কি চরিত্রের প্রয়োজনে জলে নেমেছিলেন, না কি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে?
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সহ-অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্র-কে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে জলের ভিতরে এগোচ্ছেন তিনি। আচমকাই ভারসাম্য হারিয়ে দু’জনেই পড়ে যান। সেখান থেকেই শুরু বিপর্যয়।
প্রাথমিকভাবে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে—
সমুদ্রতলের অসমান বালিতে পা পিছলে যাওয়া
জোয়ারের সময় প্রবল স্রোতের টান
চোরাবালি বা সি-বেডের ফাঁপা গঠন
এই সবকিছুর যে কোনও একটি, বা সম্মিলিত প্রভাবে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে অনুমান।
সহ-অভিনেত্রী কোনওভাবে তীরে ফিরতে সক্ষম হলেও রাহুল আর পারেননি। প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, তাঁকে উদ্ধার করতে দেরি হয়েছিল। যদিও ইউনিটের অন্য অংশ বলছে, দ্রুতই তাঁকে জল থেকে তোলা হয়। এই অসঙ্গতিই তদন্তে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
নিরাপত্তা নিয়েও উঠছে গুরুতর অভিযোগ। ঘটনাস্থলে কোনও লাইফগার্ড বা জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা ছিল না বলে জানা যাচ্ছে। সমুদ্রে শ্যুটিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে এই ঘাটতি কীভাবে রয়ে গেল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এমনকি শ্যুটিংয়ের প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা।
উদ্ধারের পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, তখনও তাঁর শ্বাস চলছিল। তবে শেষরক্ষা হয়নি। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে উল্লেখ, দীর্ঘ সময় জলের নীচে থাকার ফলে ফুসফুসে নোনা জল ও বালি জমেছিল—যা উদ্ধার সংক্রান্ত বয়ানের সঙ্গে নতুন করে অসঙ্গতি তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে, এই মৃত্যু যেন দুই স্তরের এক গল্প—একদিকে বাস্তবের নির্মম ট্র্যাজেডি, অন্যদিকে নিজের লেখার অদ্ভুত প্রতিধ্বনি।
একজন শিল্পী, যিনি কল্পনায় এঁকেছিলেন নিজের অকাল অবসান, শেষ পর্যন্ত যেন সেই একই পরিণতির মুখোমুখি হলেন বাস্তবেও।
তবে এই ঘটনার বহু প্রশ্নের উত্তর এখনও অমীমাংসিত। শ্যুটিং চলছিল কি না, উদ্ধার হতে দেরি হয়েছিল কি না, নিরাপত্তার ঘাটতি কতটা—এই সমস্ত ‘মিসিং লিঙ্ক’ স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত রাহুলের মৃত্যুর রহস্য হয়তো পুরোপুরি উন্মোচিত হবে না।







