জন্মের তারিখ অনুযায়ী বয়স কত, তা হিসেব করা সহজ। কিন্তু জানেন কি, আপনার ‘হার্ট এজ’ বা হৃদ্স্বাস্থ্যের আনুমানিক বয়স কত? অনেক সময় এই দুই বয়স এক হয় না। কারণ বয়স বাড়ার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, শরীরচর্চার অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ এবং অপর্যাপ্ত ঘুম হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির উপর ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলতে পারে।
চিকিৎসকদের ব্যাখ্যায়, ‘হার্ট এজ’ বলতে হৃদ্যন্ত্রের প্রকৃত বয়স বোঝানো হয় না। বরং এটি ভবিষ্যতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি বোঝানোর একটি উপায়। কারও হার্ট এজ যদি তাঁর প্রকৃত বয়সের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে একই বয়সের অন্য ব্যক্তির তুলনায় তাঁর কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
এই ঝুঁকির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ উচ্চ রক্তচাপ। কলকাতার বিএম বিড়লা হার্ট হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের ডিরেক্টর ডাঃ অঞ্জন সিওটিয়া জানান, উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম সমস্যা হল অনেক ক্ষেত্রেই এর কোনও স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। অথচ দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং হার্ট ফেলিওরের আশঙ্কা বাড়তে পারে।
বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনও হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে উচ্চ রক্তচাপকে চিহ্নিত করেছে। দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃদ্যন্ত্র এবং রক্তনালির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যার ফলে ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়ে।
জয়পুরের সিকে বিড়লা হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ অশ্বনী কুমার শর্মার মতে, দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ রক্তনালি এবং হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।
অন্যদিকে, কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলেও অনেক সময় তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকে না। রক্ত পরীক্ষা করলেই বিষয়টি ধরা পড়ে। ডাঃ চিরাগ ডি-এর মতে, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল অ্যাথেরোস্ক্লেরোটিক প্লাক তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই প্লাক রক্তনালির ভিতরের জায়গা সরু করে দেয় এবং রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
ডায়াবেটিসও হৃদ্স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে রক্তনালির ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হৃদ্রোগ এবং স্ট্রোকজনিত মৃত্যুর ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
শুধু ওজন বেশি হওয়াই নয়, বিশেষ করে কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমাও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের মতো সমস্যা একসঙ্গে দেখা দিতে পারে।
ধূমপান এবং তামাক সেবনের ক্ষতিকর প্রভাবও হৃদ্যন্ত্রের উপর পড়ে। ডাঃ অশ্বনীর মতে, ধূমপানের কারণে রক্তনালির অভ্যন্তরীণ আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। ডাঃ চিরাগের মতে, তামাক শরীরে প্রদাহ এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতাও বাড়াতে পারে।
এর পাশাপাশি দীর্ঘ সময় বসে থাকা, শরীরচর্চার অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাবার, অতিরিক্ত অ্যালকোহল এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপও হৃদ্স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বেশি নুন, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়াও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ঘুমের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ডাঃ অশ্বনীর মতে, ঘুমের গুণমান খারাপ হওয়া বা দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে উচ্চ রক্তচাপ-সহ একাধিক কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে বয়স এবং পারিবারিক ইতিহাসের মতো কিছু বিষয় পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতের ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত।
ডাঃ চিরাগের বক্তব্য অনুযায়ী, কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি কোনও স্থির বিষয় নয়। রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা, ওজন, শরীরচর্চা এবং ধূমপানের মতো বিষয়গুলি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এবং চিকিৎসার মাধ্যমে এগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব।
আধুনিক বিভিন্ন ঝুঁকি নির্ণায়ক ব্যবস্থায় বয়স, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, কিডনির কার্যক্ষমতা, বডি মাস ইনডেক্স, ডায়াবেটিস এবং ধূমপানের মতো একাধিক তথ্য বিবেচনা করে ভবিষ্যতের কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি হিসেব করা হয়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ‘প্রিভেন্ট’ সমীকরণগুলিতেও এই ধরনের বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে ‘হার্ট এজ’ বা সম্ভাব্য কার্ডিওভাসকুলার বয়সের একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
তবে এই সংখ্যা দেখে এমনটা ভাবার কারণ নেই যে হৃদ্যন্ত্র সত্যিই সেই বয়সে পৌঁছে গিয়েছে। এটি মূলত সম্ভাব্য ঝুঁকি বোঝানোর একটি পরিমাপক।
তিন কার্ডিওলজিস্টের বক্তব্যেই একটি বিষয় স্পষ্ট—হৃদ্রোগের কোনও উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা ঠিক নয়। কারণ উচ্চ রক্তচাপ বা অস্বাভাবিক কোলেস্টেরলের মতো সমস্যা অনেক সময় কোনও লক্ষণ ছাড়াই শরীরে চলতে থাকে।
তাই নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং কোলেস্টেরল পরীক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। পরিবারে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে কিংবা একাধিক ঝুঁকির কারণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো যেতে পারে।
ডাঃ চিরাগের মতে, ‘হার্ট এজ’ কমানোর বিষয়টি আসল লক্ষ্য নয়। মূল উদ্দেশ্য হল রক্তনালির এমন ক্ষতি প্রতিরোধ করা, যা পরবর্তীতে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা হার্ট ফেলিওরের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
জন্মের তারিখ অনুযায়ী বয়স পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কতটা বাড়বে, তা অনেকাংশেই জীবনযাপন, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সময়ে চিকিৎসা নেওয়ার উপর নির্ভর করতে পারে।







