একসময় যাদের ‘চোকার্স’ বলে কটাক্ষ করা হত, সেই দক্ষিণ আফ্রিকা আজ টেস্ট ক্রিকেটের রাজসিংহাসনে। লর্ডসের পবিত্র মাটিতে ইতিহাস লিখলেন টেম্বা বাভুমারা। এক কৃষ্ণাঙ্গ অধিনায়কের নেতৃত্বে ক্রিকেট দুনিয়ার দীর্ঘতম ফরম্যাটে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হল দক্ষিণ আফ্রিকা। ২৭ বছর পর আইসিসি ট্রফি জিতে ঘুচল হতাশার অধ্যায়, ভাঙল ‘অভিশপ্ত’ অতীতের শৃঙ্খল।
অ্যাপার্থেইড পলিসির জেরে দীর্ঘ ২১ বছরের নির্বাসন। ১৯৯৮ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর একের পর এক সেমিফাইনালে হোঁচট। রানআউটে শেষ হওয়া ১৯৯৯ বিশ্বকাপ, ২০২4-এ টি-টোয়েন্টি ফাইনালে হেরে যাওয়া—এই সব ব্যর্থতা দক্ষিণ আফ্রিকাকে গেঁথে দিয়েছিল ‘চোকার্স’ তকমায়। সেই দাগ মুছে দিলেন বাভুমা, মার্করাম, রাবাডারা।
প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৩৮ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর যখন দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮২ রানের লক্ষ্যমাত্রা, তখন অনেকেই ধরেই নিয়েছিলেন ম্যাচ ফসকে গেল। কিন্তু এডেন মার্করামের ১৩৬ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস ও চোট নিয়েও বাভুমার ধৈর্যশীল লড়াই প্রোটিয়াদের ইতিহাসে সোনালি অধ্যায় যোগ করল। অস্ট্রেলিয়ার স্টার্ক, কামিন্স, হেজ়লউডদের সামনে একবারও ভেঙে পড়েননি তাঁরা।
এই জয় শুধু একটা ট্রফি নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার সামাজিক ও ক্রীড়া ইতিহাসের জয়। ১৮৮০ সালে ব্রিটিশদের হাত ধরে ক্রিকেটে প্রবেশ, ১৯৭০ সালে বর্ণবিভেদ নীতির জন্য নির্বাসন, ১৯৯১ সালে ফিরে আসা এবং ২০২৫ সালে এসে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া—এই যাত্রাপথ যেন এক মহাকাব্য। আর সেই কাব্যের নায়ক টেম্বা বাভুমা, যিনি একসময়ে নিজেকে লর্ডসের মাঠে খেলার যোগ্য ভাবতেন না।
টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ শতরানকারী, তিন ফরম্যাটে খেলা একজন অধিনায়ক, যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন টানা ১০টি টেস্টে অপরাজিত থেকে। সামাজিক বিভাজন, শরীরী বিদ্রুপ, কোটার অভিযোগ—সব কিছুর জবাব দিয়েছেন পারফরম্যান্সে। সেই বাভুমাই আজ দক্ষিণ আফ্রিকার মুখ।
ডিভিলিয়ার্স, স্মিথ, ক্যালিস, পোলক, ডোনাল্ড—যাঁরা এই জয় দেখে যেতে পারেননি, তাঁরা হয়তো গর্বে গলা ভার করে বসে আছেন গ্যালারিতে বা টিভির সামনে। সবার চোখে জল—এবার আর হারার নয়, এটা জয়ের জল। এই লর্ডস সাক্ষী থাকল এক ঐতিহাসিক রূপকথার, যেখানে বর্ণবিদ্বেষের ইতিহাসকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হল এক সময়ের ‘চোকার্স’।







