দেশ

১২ বছর পর মুক্ত ‘সন্ত’ রামপাল: বিতর্ক, রক্তাক্ত অতীত আর নতুন প্রশ্ন

প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় কারাবাসের পর আবারও জাতীয় শিরোনামে উঠে এলেন স্বঘোষিত ধর্মগুরু Sant Rampal। ১২ বছর পর জেল থেকে বেরিয়ে আশ্রমে ফেরার মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক— কারও চোখে এটি ‘বিজয়ী প্রত্যাবর্তন’, আবার অনেকের কাছে অতীতের রক্তাক্ত অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি।

Punjab and Haryana High Court-এর নির্দেশে ৭৫ বছর বয়সী এই ধর্মগুরু সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। ২০১৪ সালের দেশদ্রোহিতা ও হিংসার মামলায় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, বয়স এবং ইতিমধ্যেই ১১ বছরের বেশি কারাবাসের বিষয়টি বিবেচনা করে আদালত এই সিদ্ধান্ত নেয়। বিচারকদের পর্যবেক্ষণ— এখনও বহু সাক্ষীর জবানবন্দি বাকি, ফলে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা যুক্তিযুক্ত নয়।

২০১৪: বারওয়ালা আশ্রমে ১০ দিনের অবরোধ, মৃত্যু আর দাগ
হরিয়ানার হিসারের বারওয়ালায় অবস্থিত আশ্রম ঘিরে ২০১৪ সালের ঘটনাই রামপালের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পুলিশের হাতে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও তাঁকে আটক করতে গেলে শুরু হয় তীব্র সংঘর্ষ। হাজার হাজার অনুগামী মানবপ্রাচীর গড়ে তোলেন আশ্রম ঘিরে। অভিযোগ ওঠে, পেট্রল বোমা ও অ্যাসিড পাউচ ব্যবহার করা হয়, এমনকি নারী ও শিশুকেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

প্রায় ১০ দিন ধরে চলা এই অচলাবস্থার পর ১৮-১৯ নভেম্বর পুলিশের অভিযানে আশ্রম থেকে উদ্ধার হয় পাঁচ মহিলা ও এক শিশুর দেহ। বহু পুলিশকর্মী আহত হন। সেই রাতেই রামপাল-সহ প্রায় ৯০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনাটি দেশের অন্যতম বিতর্কিত ধর্মীয় সংঘর্ষ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়।

আজীবন কারাদণ্ড থেকে জামিন
২০১৮ সালে ছয় জনের মৃত্যুর মামলায় রামপালকে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ২০২৫ সালে হাইকোর্ট সেই সাজা স্থগিত রাখে। মৃতদের পরিবারের অভিযোগ ছিল— পুলিশের টিয়ার গ্যাসেই শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু হয়েছিল, যা মামলার মূল ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

অবশেষে ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল, অবরোধ ও দেশদ্রোহিতা-সহ একাধিক মামলায় তাঁকে জামিন দেয় আদালত। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই নতুন করে শুরু হয়েছে আইনি ও সামাজিক বিতর্ক।

ইঞ্জিনিয়ার থেকে ‘গডম্যান’
১৯৫১ সালে হরিয়ানার সোনিপতের এক গ্রামে জন্ম রামপালের। পেশায় ছিলেন সরকারি সেচ দফতরের জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার। ১৯৯৪ সালে এক কবীর-পন্থী সাধুর সংস্পর্শে এসে চাকরি ছেড়ে ধর্মীয় পথে পা বাড়ান। এরপরই তিনি হয়ে ওঠেন ‘সন্ত রামপালজি মহারাজ’।

তাঁর প্রচারে ছিল কিছু কঠোর সামাজিক বার্তা— মূর্তি পূজার বিরোধিতা, নেশা-বিরোধী অবস্থান এবং পণ প্রথার বিরুদ্ধে সরব ভূমিকা। তবে ২০০৬ সালে Arya Samaj-এর বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগেই শুরু হয় তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম বড় আইনি বিতর্ক। তারপর থেকেই তিনি ক্রমে ভারতের অন্যতম বিতর্কিত ধর্মগুরুতে পরিণত হন।

এখন প্রশ্ন একটাই…
জেল থেকে মুক্তির পর রামপালের এই প্রত্যাবর্তন কি তাঁর প্রভাব পুনর্গঠনের সূচনা? নাকি পুরনো বিতর্কই আবার নতুন করে সামনে আসবে?

আইনি লড়াই এখনও শেষ হয়নি। কিন্তু একথা স্পষ্ট— ‘সন্ত’ রামপাল নামটি আবারও জনচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Adblock Detected

Please Turn Off Your Ad Blocker.