কলকাতা: সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার সাফল্যের ইতিহাসে যুক্ত হল এক নতুন অধ্যায়। মাত্র একুশ বছরের অন্তঃসত্ত্বা মহিলার হার্ট বন্ধ রেখে সফল অস্ত্রোপচার করে নজির গড়ল এসএসকেএম হাসপাতালের কার্ডিও-থোরাসিক বিভাগ। পাঁচ মাসের গর্ভস্থ সন্তানকে বাঁচিয়ে, মায়ের প্রাণ ফিরিয়ে আনার এই কীর্তি এখন চর্চার কেন্দ্রবিন্দু।
কোচবিহারের বাসিন্দা জবা বর্মণ (২১), পেশায় টোটোচালক নিতাই বর্মণের স্ত্রী। গত সেপ্টেম্বরে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে ইকো টেস্টে ধরা পড়ে ‘র্যাপচার্ড সাইনাস অফ ভালসালভা’ — এক বিরল ও মারাত্মক হার্টের রোগ। জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, এই রোগে হৃদপিণ্ডের প্রধান ধমনীর একাংশ অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হয়ে ফেটে যায়। ফলে মহাধমনীর রক্ত সরাসরি হৃদপিণ্ডের ডান প্রকোষ্ঠে প্রবাহিত হয়, যার ফলে রোগীর শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা এবং প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি হয়।
প্রথমে রোগীর শরীরে একটি যন্ত্র বসিয়ে রক্ত প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই যন্ত্রের পাশে ফুটো দেখা দিলে শারীরিক অবনতি শুরু হয়—জ্বর, জন্ডিস, হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া, সেপসিস—সব মিলিয়ে সংকটজনক পরিস্থিতি।
তবু হাল ছাড়েননি চিকিৎসকরা। গঠিত হয় ১৪ জনের বিশেষ মেডিক্যাল টিম—কার্ডিওথোরাসিক, অ্যানাস্থেসিয়া, স্ত্রীরোগ, পারফিউশন বিভাগ ও নার্সিং টিমের সমন্বয়ে। হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস যন্ত্রের সাহায্যে (Heart-Lung Machine) অস্ত্রোপচার করা হয় বৃহস্পতিবার। ৯০ শতাংশ ভ্রূণ মৃত্যুর সম্ভাবনা, মায়ের প্রাণসংশয়—সব আশঙ্কাকে পিছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত সফল অপারেশন।
অস্ত্রোপচারের পর বর্তমানে মা ও গর্ভস্থ সন্তান দু’জনেই সুস্থ।
জবার স্বামী নিতাই বর্মণ বলেন, “ডাক্তারেরা যেন দেবতার মতো কাজ করেছেন। এত ভালো চিকিৎসা পেয়েছি, ভাবিনি ওরা দু’জনেই বাঁচবে।”
কার্ডিওথোরাসিক সার্জারির প্রফেসর শুভেন্দু শেখর মহাপাত্র বলেন, “রোগীর জন্ডিস ও একাধিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও আমরা চেষ্টা চালাই। এই অপারেশন সফল হওয়ায় আমরা গর্বিত।”
সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার এই দৃষ্টান্ত শুধু চিকিৎসা ক্ষেত্রেই নয়, মানবিকতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এসএসকেএম টিম প্রমাণ করল — হৃদস্পন্দনের সঙ্গে লড়ে জীবন ফেরানোও সম্ভব!







