দেশ

কালের গর্ভে বিস্মৃত রাষ্ট্রগুরু : এক কিংবদন্তি জীবনের নীরব প্রস্থান

৬ আগস্ট ১৯২৫ — এই দিনে চিরবিদায় নেন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম পথিকৃৎ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। ব্রিটিশ ভারতের অন্ধকার সময়ে যিনি জাতীয়তাবাদের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, আজ তাঁর মৃত্যুদিনে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে এক সংগ্রামী আত্মার নিঃশব্দ অবসানকে।

১৮৪৮ সালের ১০ নভেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান এবং অদম্য পরিশ্রমে ১৮৭১ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় পাশ করেন — যা তৎকালীন বাঙালির কাছে এক বিরল কৃতিত্ব। কিন্তু এখানে থেকেই শুরু হয় অন্যায়ের অধ্যায়। একটি তুচ্ছ কারণে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। পরে পুনর্বহাল হলেও আর সেভাবে কাজ করতে পারেননি। ব্রিটিশ প্রশাসনের জাতিগত বৈষম্য ও ঔপনিবেশিক অহংকার তাঁর ওপর চরম আঘাত হানে।

চাকরি ছেড়ে তিনি রাজনীতির ময়দানে নামেন। ১৮৭৬ সালে আনন্দমোহন বসুর সঙ্গে গঠন করেন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন, যা কংগ্রেস গঠনের পূর্বসূরী। তিনি বিশ্বাস করতেন সংবিধানসম্মত পথে, যুক্তি ও শিক্ষার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ জাগ্রত করা যায়। ১৯০৬ ও ১৯০৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হন, এবং মডারেট নীতির একজন প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।

তিনি ছিলেন এক নির্ভীক সাংবাদিক। দ্য বেঙ্গলি পত্রিকায় তিনি ব্রিটিশ শাসনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতেন। পাশাপাশি তিনি স্থাপন করেন রিপন কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ), যাতে মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবকদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ে।

ব্রিটিশ সরকার একসময় তাঁকে “Sir” উপাধিতে ভূষিত করে, কিন্তু অনেকেই মনে করেন তাঁর মতো একজন সংগ্রামীকে এভাবে ঠান্ডা করা হয়েছিল।

তাঁর আত্মজীবনী A Nation in Making কেবল তাঁর জীবন নয়, এক সমগ্র জাতির আত্মপরিচয়ের খোঁজ।

সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ছিলেন এমন একজন যিনি অন্যায় সয়েছেন, অপমান সহ্য করেছেন, তবু ভারতের জন্য নিজের অস্তিত্ব উৎসর্গ করেছেন। তাঁর মৃত্যু এক অধ্যায়ের সমাপ্তি, তবে আদর্শ আজও অম্লান।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Adblock Detected

Please Turn Off Your Ad Blocker.