যেদিকে তাকানো যায়, চোখে পড়ছে শুধু জল আর জল। চাষের জমি থেকে বসতবাড়ি—গঙ্গার ভয়াল স্রোতে একের পর এক সর্বস্ব হারাচ্ছেন মালদহের ভুতনির মানুষ। মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও হারিয়ে বহু পরিবার এক কাপড়ে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কারও আশ্রয় মিলেছে ত্রাণশিবিরে, আবার অনেকের ভাগ্যে সেটুকুও জোটেনি। একমুঠো চিঁড়ে-গুড়ের আশায় শিশু থেকে বৃদ্ধ—ডিঙি নৌকায় জল পেরিয়ে ছুটছেন দুর্গতরা।
গঙ্গার এই ভয়াবহ রূপে রাতের ঘুম উড়েছে ভুতনিবাসীর। নদীভাঙন ও বন্যার জেরে কার্যত বদলে যেতে বসেছে এলাকার ভৌগোলিক চিত্র। আর মাত্র এক সপ্তাহ পর দুর্গাপুজো। কিন্তু উৎসবের আমেজ থেকে বহু দূরে বানভাসি মানুষ। যেখানে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের ন্যূনতম সংস্থানই বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে পুজোর মুখে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। মালদহে বন্যা ও ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মোট ২৪২ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেন তিনি।
ভাঙনকবলিত মালদহে কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আগে রতুয়া থেকে হেলিকপ্টারে বিপর্যস্ত এলাকাগুলি ঘুরে দেখেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রায় ২০ মিনিটের আকাশপথের যাত্রায় এলাকার ভয়াবহ পরিস্থিতি নিজের মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করেছেন বলেও জানান তিনি। এরপর মানিকচকে পৌঁছে দুর্গতদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন শুভেন্দু। তাঁর কথায়, এই দুর্ভোগ থেকে মানুষকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করার অঙ্গীকার নিয়েই তিনি ফিরছেন।
জেলাশাসকের সঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠকের পর রতুয়া, মানিকচক ও ইংরেজবাজারের পরিস্থিতি নিয়ে স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ২৪ হাজার ৫৯৫টি বাড়ি মেরামতির জন্য প্রতিটি পরিবারকে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ২২ হাজার ৩৪০টি পরিবারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৯০ হাজার টাকা করে।
পুজোর আগে দুর্গতদের জন্য বিশেষ সাহায্যের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ৫ হাজার পরিবারের হাতে পোশাক, মশারি ও খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ২১টি সরকারি ত্রাণশিবিরে পাঁচ দিন অন্তর ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি ২৫টি কমিউনিটি কিচেনের মাধ্যমে দুর্গতদের রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হবে। শুধু মানুষ নয়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গবাদি পশুর জন্যও খাদ্যের ব্যবস্থা করবে প্রশাসন। ত্রাণবণ্টনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কৃষি, সেচ ও মৎস্য দফতরকে।
মালদহে দাঁড়িয়ে আগের সরকারগুলির ভূমিকা নিয়েও সরব হন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, গত ৫০ বছরেও মালদহের মানুষের দুর্দশা দূর করার জন্য কোনও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ করেনি। দুর্গতদের আর জলের মধ্যে ফেলে রাখা হবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবে কাজ করে দেখানোর বার্তাই দেন মুখ্যমন্ত্রী।
গঙ্গাভাঙন রুখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানান শুভেন্দু। তাঁর দাবি, এই সমস্যা মোকাবিলায় কানপুর আইআইটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিপিআর-এর কাজ শেষ করে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ৩৩০০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মহালয়ার আগেই মালদহে ১ হাজার ২৪৮ কিলোমিটার রাস্তা মেরামতের আশ্বাস দিয়ে যান মুখ্যমন্ত্রী। অর্থাৎ, পুজোর আগে দুর্গত মালদহে ত্রাণের পাশাপাশি পরিকাঠামো পুনর্গঠনের কাজেও জোর দেওয়ার বার্তা দিল রাজ্য সরকার।







