সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে—পশ্চিমবঙ্গে ‘১০০ দিনের কাজ’ প্রকল্প (MGNREGA) অবিলম্বে চালু করতে হবে এবং রাজ্যের আটকে রাখা প্রাপ্য অর্থ দ্রুত মুক্তি দিতে হবে। কিন্তু রায় ঘোষণার পর দুই সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের তরফে কার্যত নিস্তব্ধতা। কেবল একটি চিঠি পাঠিয়ে অতীতের কিছু তথ্য যাচাইয়ের অনুরোধ—যা নবান্নের মতে, “টাকা আটকে রাখার সময় আরও দীর্ঘায়িত করার কৌশল”।
কেন এই নীরবতা? উঠে আসছে বড় কয়েকটি ইঙ্গিত
সূত্রের খবর, চলতি কেন্দ্রীয় বাজেটে ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের জন্য MGNREGA-য় বরাদ্দই ‘শূন্য’। ফলে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ পালন করতে গেলে কেন্দ্রকে লোকসভায় সাপ্লিমেন্টারি বাজেট এনে নতুন অর্থবরাদ্দ অনুমোদন করাতে হবে। প্রশাসনিক মহলের দাবি—এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিক সদিচ্ছা ব্যতীত সম্ভব নয়। আর পর্যবেক্ষকদের একাংশ বলছেন, “কেন্দ্র সেই সদিচ্ছা দেখাচ্ছে না বলেই আজকের এই নীরবতা।”
আইন যা বলছে
২০০৫ সালের গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন স্পষ্ট বলে—কোনও প্রকার শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নিলেও কেন্দ্র রাজ্যের ‘মজুরি’ বা ‘পরিশ্রমিক’ আটকে রাখতে পারে না। তার পরও ২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের বকেয়া বিল বন্ধ রেখেছে।
সুপ্রিম কোর্টের মত, “কাজ বন্ধ রাখা এবং টাকা আটকে রাখা—দুটিই আইনের পরিপন্থী।” রায় অমান্য হলে তা সরাসরি আদালত অবমাননা হিসেবে বিবেচিত হবে। কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগঠনের একাংশ ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের বিরুদ্ধে অবমাননার মামলা করার সতর্কতা দিয়েছে।
দিল্লির নীরবতা কেন?
রাজ্যের সূত্রের দাবি—রায় ঘোষণার পর নবান্ন একাধিকবার কেন্দ্রকে বৈঠকের প্রস্তাব পাঠালেও কোনও ইতিবাচক যোগাযোগ আসেনি। “দিল্লি বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবেই লম্বা করছে”—এমনই অভিযোগ পঞ্চায়েত দফতরের।
এদিকে শুভেন্দু অধিকারী বুধবার অভিযোগ তুলেছেন—“১০০ দিনের প্রকল্পে দুর্নীতি করেছে রাজ্য।” পাল্টা প্রশ্ন ওঠাচ্ছে রাজনৈতিক মহল—তাহলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত যখন প্রকল্প চালু রাখতে বলেছে, কেন্দ্র কেন দাঁড়িয়ে রয়েছে? রাজনৈতিক সংঘাত কি আদালতের নির্দেশের উপরেও উঠতে পারে?
এক নজরে প্রকৃত চিত্র
বাংলায় নিবন্ধিত MGNREGA কর্মী: প্রায় ২.৭ কোটি
আটকে থাকা বকেয়া বিল: ৭,৫০০ কোটি টাকারও বেশি
২০২১ থেকে এ পর্যন্ত ওয়ার্কডেজ কমে হয়েছে: প্রায় ৭০%
ফলশ্রুতি: গ্রামে গ্রামে বাড়ছে দারিদ্র, ঋণের বোঝা, ও কাজের সন্ধানে পলায়ন—অর্থাৎ মাইগ্রেশন।
MGNREGA কেবল একটি কর্মসংস্থান প্রকল্প নয়—এটি গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের শেষ সুরক্ষাবর্ম। দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে, কাজ না পেলে, বাজারদর ভেঙে পড়লে—এই প্রকল্পই বিপন্ন পরিবারগুলিকে বাঁচিয়ে রাখে। প্রকল্প বন্ধ থাকায় সেই সুরক্ষাবলয় আজ প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
সবশেষে বড় প্রশ্ন
সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্র কেন প্রকল্প চালু করছে না?
অর্থের অভাব?
নাকি রাজনৈতিক দ্বন্দ্বই আসল বাধা?
উত্তর এখনও অজানা—কিন্তু অপেক্ষায় রয়েছে লক্ষ-লক্ষ গ্রামীণ শ্রমিক পরিবার।







